ধানের দাম বেশি হলেও কৃষক লোকসানে

চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম বেশি হলেও লোকসান গুনছে কৃষক। পাহাড়ি ঢলে ও অতি বৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যা, প্রতিকূল আবহাওয়াজনিত রোগবালাইয়ের কারণে ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন হয়নি। অপরদিকে গত বছরের তুলনায় চাষাবাদ ও ধান কাটা শ্রমিক খরচ বেশি হওয়ায় ধানের উত্পাদন খরচ বেড়েছে।

সম্প্রতি হাওরাঞ্চল ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, চলতি বোরো মৌসুমে সারাদেশে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করা হয়। এরমধ্যে বোরো রোপণ করা হয়েছে ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে। আর বোরো উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার টন। গত বছর ১ কোটি ৯০ লাখ টন উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও উত্পাদন হয়েছিল ১ কোটি ৮৯ লাখ ৩৭ হাজার টন।

সূত্র জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে সিলেট বিভাগের ৪ জেলা হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও সিলেটে মোট ৪ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। এ ছাড়া নেত্রকোনায় ১ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর ও কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। সবমিলিয়ে হাওরবেষ্ঠিত এই ৬ জেলায় মোট ৮ লাখ ২৫ হাজার  হেক্টর জমিতে এবার বোরোর আবাদ হয়েছিল।

কিন্তু পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ৬টি জেলার সবকটি হাওর প্লাবিত হয়ে সিলেট বিভাগের ৪ জেলায় ২ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টরে জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া  নেত্রকোনায় ৭০ হাজার ও কিশোরগঞ্জে  ৫৭ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যায় ৩ লাখ ৮১ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে এবার বোরোর উত্পাদন কম হবে।

সম্প্রতি খাদ্যভবনে চালকল মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, হাওরে অকাল বন্যায় ও ব্লাস্ট রোগে এবার ১৫ লাখ টন ধান নষ্ট হয়েছে যা চালের হিসেবে ১০ থেকে ১২ লাখ টন। তবে প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ লাখ টন চাল উদ্বৃৃত্ত থাকে। তাই দেশে বছরে প্রায় ৩ কোটি টন চালের চাহিদা মেটাতে কোনো সমস্যা হবে না।

এদিকে হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যায় বোরো নষ্টের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে বোরোর ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গত বছরের তুলনায় চাষাবাদ ও ধান কাটা শ্রমিক খরচ বেশি হওয়ায় ধানের উত্পাদন খরচ বেড়েছে। ফলে এবার ধানের দাম বেশি হলেও লোকসান গুনছেন কৃষক।

রায়গঞ্জ উপজেলার প্রসিদ্ধ ধানের হাট চান্দাইকোনার ধান ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম জানান, গত ৩/৪ হাট ধরে নতুন বোরো ধান বাজারে আমদানি হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় আমদানি কম। ফলে চড়া দামে এবার ধান কিনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, গত কয়েক হাটের তুলনায় গত শনিবারের হাটে মণ প্রতি ৩০ টাকা কমে ধান কিনেছেন। এ হাটে তিনি মিনিকেট কিনেছেন প্রতিমণ ৮৮০ থেকে ৯৫০ টাকা, ব্রিধান ২৮- ৮০০ থেকে ৮৫০, কাজল লতা ৯০০ থেকে ১০০০ ও হিরা ধান প্রতিমণ ৭০০ থেকে ৭৪০ টাকায়। যা গত বছর এই মৌসুমে ছিল মিনিকেট ৬০০ থেকে ৬৪০ টাকা, কাজল লতা ৭০০ থেকে ৭৫০, ব্রিধান ২৮-৫০০ থেকে ৫৫০ ও হিরা ধান ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।

এক প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ীরা ইত্তেফাককে জানান, এবার মৌসুমের শুরুতেই ধানের দাম বেশি দেখে বড় বড় জোতদাররা আরো বেশি দাম পাওয়ার আশায় ধান মজুত করছেন। ফলে বাজারে ধানের আমদানি অপেক্ষাকৃত কম। এরপরও প্রতি হাটে ধানের দাম ক্রমশ নিম্নমুখী হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা জানান, সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক তুলে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। এতে ধান-চালের দর নিম্নমুখী হতে পারে।

উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের রুদ্রপুর গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন জানান, তিনি গত মৌসুমের মতো এবারও ১২ বিঘা জমিতে উচ্চফলনশীল ধানের আবাদ করেছেন। গত বছর ধান পেয়েছিলেন প্রায় ৩৫০ মণ। এবার একই জমিতে দেড়গুণ খরচে আবাদ করে পেয়েছেন মাত্র ২১১ মণ ধান। অসময়ে শিলাবৃষ্টি, ঝড় ও নেকব্লাস্ট রোগের কারণে ফলন কম হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ৮ শতক জমির ধানে কাঁচি লাগানোই যায়নি।

রুদ্রপুর গ্রামের এই কৃষক বলেন, গত বছর বিঘা প্রতি আবাদে খরচ হয়েছিল ৮ হাজার ৪৫০ টাকা। এ বছর খরচ হয়েছে ১১ হাজার ৫৫০ টাকা। হাল-চাষ, নিড়ানি, সার, পানি, চারা ও মাড়াই বাবদ খরচ হয়েছে মোট ৬ হাজার ৭৫০ টাকা। আপদকালীন আবহাওয়ার কারণে বিঘা প্রতি ধান কাটা শ্রমিক বাবদ খরচ হয়েছে ৪ হাজার ৮০০ টাকা। যা গত বছরে ছিল মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। এরপর রয়েছে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন খরচ। তাই বেশি দাম পেলেও বিঘা প্রতি আবাদে লোকসান হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।

একই উপজেলার বাঐখোলা গ্রামের কৃষক আফসার আলী জানান, তিনি গত বছরের মত এবারও ১৩ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। ধান পেয়েছেন মাত্র ১৬২ মণ। গত বছরে পেয়েছিলেন ২৯৩ মণ ধান। এবার আবাদে খরচ হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আর ধান কেটে ঘরে তুলতে খরচ হয়েছে চারগুণ বেশি। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষুদ্র কৃষক। ধান বেঁচে শ্রমিক খরচ ও মহাজনের দেনা দিতেই সব ফুরিয়ে যাচ্ছে। কী খেয়ে আবাদ করব বুঝতে পারছি না।’

ইত্তেফাক/নূহু