এবারও জলাবদ্ধতার যন্ত্রণায় ভুগবে রাজধানীবাসী। বলতে গেলে বর্ষা মৌসুম একেবারেই দোরগোড়ায়। কিন্তু ভারী বর্ষণে নগরীতে যেন বিগত বছরগুলোর মতো জলাবদ্ধতা দেখা না দেয়, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি চলছে যথেষ্ট ঢিমেতালে। পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহূত ড্রেন-খাল পরিষ্কারেও নেই জোর তত্পরতা।
এ নিয়ে সিটি করপোরেশন আর ওয়াসার মধ্যে রশি টানাটানি তো আছেই। এর মধ্যে মেট্টোরেলসহ উন্নয়নমূলক কাজের জন্য নিয়মিতই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। পানি বের হওয়ার পথগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। রাজধানীর চারপাশে নদী উদ্ধারে তত্পরতা চললেও বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনার ভেঙে ফেলা অংশ থেকে যাচ্ছে নদীতীরেই। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হচ্ছে তার সুফল রাজধানীবাসী না পাবার আশঙ্কাই জোরালো হয়ে উঠছে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিয়ে গবেষণা করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিপ ইন্টারন্যাশনালের ‘জার্নি টুওয়ার্ডস ডিসাস্টার রেসিস্টেন্ট ঢাকা সিটি’ প্রকল্পের সমন্বয়ক সাইফুন নাহার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এবার বর্ষা মৌসুমে রাজধানীবাসীর যে কী অবস্থা হবে সেটা বলে বোঝানো যাবে না। পরিকল্পনাহীনতা, সমন্বয়হীনতা, কাজে গাফিলতি, ড্রেন পরিষ্কার না করেই বিল তুলে খেয়ে নেওয়াসহ উন্নয়নমূলক কাজগুলো এবার খুবই ভোগাবে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানা গেছে, এবার বৃষ্টিপাত বাড়বে। পাশাপাশি আমরা দেখছি, নদীগুলো দখলমুক্ত করা হচ্ছে। খুব ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে ২৩টি ভবন ভাঙা হয়েছে তার ডাস্ট নদীপাড়েই রয়ে গেছে। এগুলো না সরানো হলে নদীগুলো দিয়ে পানি ঠিকমতো প্রবাহিত হবে না। তাহলে এই উদ্ধার তত্পরতার সুফল মানুষ কীভাবে পাবে? ড্রেনগুলো এখনো ঠিকমতো পরিষ্কার করা হচ্ছে না। রাজনৈতিক কর্মীদের এসব কাজ দেওয়া হচ্ছে। ফলে তারা কাজ না করেই বিল তুলে নিচ্ছে। আমরা দেখছি, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা দৈনন্দিন কাজের বাইরে কিছুই করছে না।’
মেট্রোরেলসহ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার যেমন দুরবস্থা, তেমনি পানি নিষ্কাশনের প্রধান এই মাধ্যম ড্রেন নিয়েও চলছে সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসার মধ্যে আছে রশি টানাটানি। ১৯৯৬ সালের পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইনের ১৭ ধারায় বলা আছে, ঢাকা ওয়াসা পানি নিষ্কাশনের জন্য বড় ড্রেন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও খাল দেখভাল করবে।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯-এর তৃতীয় তফসিলে বলা হয়েছে, ছোটখাটো নালা, ড্রেন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে সিটি করপোরেশন। এই আইনের সুযোগে তারা পরস্পরের ওপর দোষ চাপিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের তো মূল কাজ ভিন্ন। আমরা সেটা করি। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে আমাদের যতটুকু করা দরকার, আমরা সেটা করছি। পুরো ড্রেন পরিষ্কার রাখার কাজটা সিটি করপোরেশনের। তারা নিশ্চয় সেই কাজটা করছে। আর খালগুলোর মধ্যে ২ হাজার কিলোমিটার পরিষ্কার রাখবে সিটি করপোরেশন। ওয়াসা শুধু ৩০০ কিলোমিটার খাল পরিষ্কার রাখবে। আমাদের যেটা পরিষ্কার রাখার কথা, সেটা পরিষ্কারে আমরা কাজ শুরু করেছি। পাশাপাশি ঢাকা শহরে বৃষ্টিতে জমে যাওয়া পানি পাম্প করে সেচে ফেলতে হয়। আমাদের পাম্পগুলো আমরা রক্ষণাবেক্ষণ করে ঠিক রাখার চেষ্টা করছি। মোট কথা আমাদের প্রস্তুতি আমরা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
অনেক আগে থেকেই ঢাকা ওয়াসা বলে আসছে, ড্রেন দেখভালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। আর সিটি করপোরেশন বলছে, ওয়াসার ম্যান্ডেটের মধ্যেই ড্রেনের মালিকানা দেওয়া আছে। এ অবস্থায় জলাবদ্ধতার ক্ষেত্রে দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যে আছে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা। এবার এই সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। ওয়াসার অভিযোগ, সিটি করপোরেশন সারফেস (উন্মুক্ত) ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখে না। সিটি করপোরেশন বলে ওয়াসা বক্সকালভার্ট ও স্টর্ম স্যুয়ারেজ ড্রেন পরিষ্কার রাখে না। পরিষ্কারের নামে প্রকৌশলী-ঠিকাদার টাকাগুলো লুটে নেয়। এই ঠেলাঠেলিতে পড়ে কাজগুলো ঠিকভাবে এগুচ্ছে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘গত মাসেই আমরা ওয়াসা আর পানি উন্নয়ন বোর্ড— সবাই মিলে বৈঠক করেছি। এখানে ঠেলাঠেলি নয়, সবাই মিলেই একসঙ্গে কাজ করব। ওয়াসার সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে, তারা বলেছে, সবকিছু একসঙ্গেই হবে। সামনেই বর্ষা মৌসুম, এখন আর দেরি করার সময় নেই। সবাই মিলেই কাজটা করতে হবে। আমরা সিটি করপোরেশনের কাজটা শুরু করেছি, ওয়াসাও তাদের কাজটা শুরু করবে। আমরা চেষ্টা করব যতটা কম রাখা যায় জলাবদ্ধতা।’
জানা গেছে, রাজধানীতে প্রায় ১০ কিলোমিটার বক্সকালভার্ট রয়েছে। এই বক্সকালভার্ট বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম। এছাড়া রয়েছে সাড়ে তিনশ কিলোমিটার স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইন। এ দুটি মাধ্যমেই বৃষ্টির পানি বিভিন্ন জলাশয়, খাল বা নদীতে পড়ে। এগুলো দেখভাল করে ঢাকা ওয়াসা। এছাড়া ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের রয়েছে ২ হাজার ৫১ কিলোমিটার উন্মুক্ত (সারফেস) ড্রেন। মূলত বৃষ্টির পানি ওই সারফেস ড্রেন দিয়ে বক্সকালভার্ট বা স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইনে প্রবেশ করে। স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইন বা বক্সকালভার্ট দিয়ে সরাসরি সেই পানি নিচু জলাশয়ে গিয়ে জমা হয়। কিছু পানি পাম্প করেও বের করা হয়।
জানা যায়, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম শেষে দেখা যায় বক্সকালভার্ট ও স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইনগুলোর অন্তত ৮০ শতাংশই ভরাট হয়ে যায়। সেগুলো পরিষ্কারের জন্য প্রতি বছর অক্টোবর মাস থেকেই নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবার সেই উদ্যোগ নিতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। এখনও সেই কাজ পুরোপুরি শুরু হয়নি।
আরও পড়ুনঃ সুন্দরবনে মধু আহরণের মৌসুম শুরু হয়েছে
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, স্টর্ম স্যুয়ারেজ ও বক্সকালভার্ট পরিষ্কারের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। আর সারফেস ড্রেন পরিষ্কারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সারফেস ড্রেনগুলো পরিষ্কারের ব্যাপারে দুই সিটি করপোরেশন কাজ করছে। কিন্তু বক্সকালভার্ট ও স্টর্ম স্যুয়ারেজ যদি পরিষ্কার করা না হয় তাহলে সারফেস ড্রেন পরিষ্কার করে কোনো লাভ হবে না। তারা বলেন, কারণ সারফেস ড্রেনের পানি বক্স কালভার্ট ও স্টর্ম স্যুয়ারেজ ড্রেন দিয়েই যায়। সেগুলো পরিষ্কার না হলে বৃষ্টির পানি রাস্তার ওপরেই ভাসতে থাকবে। তবে সিটি করপোরেশন সারফেস ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করে। এবারও সেটা করছে।
ইত্তেফাক/নূহু