টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে (এসডিজি) আগামী অর্থবছরের বাজেটে মায়েদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। একইসঙ্গে চাহিদা ভিত্তিক পলিসি ও টেকসই মূল্যবোধ তৈরির কথা বলেন বক্তারা। দেশকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, মায়ের চেয়ে শক্তিশালী শব্দ আর নেই।
রবিবার সকালে রাজধানীর ইত্তেফাক কার্যালয়ের মজিদা বেগম মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে মা দিবসের একযুগ : টেকসই উন্নয়নে মায়ের স্বপ্ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভার আয়োজক যৌথভাবে বেসরকারি সংস্থা ডরপ ও দৈনিক ইত্তেফাক।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। প্রধান অতিথি ছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য কাজী রোজী, বেগম নাসিমা ফেরদৌসি, বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিন আহমেদ চৌধুরী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ডরপ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এএইচএম নোমান।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক বলেন, বর্তমান সরকার নারীবান্ধব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মমতাময়ী মা। দেশকে নিজের সন্তান, নিজের মা মনে করে এগিয়ে নিতে নিরলস কাজ করছেন। গত দুই দশকে দেশের নারীরা অনেক এগিয়েছে। তবে পথ এখনও শেষ হয়নি।
তিনি বলেন, সরকার মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা দেয়। সেই ভাতা মায়ের জন্য খরচ হচ্ছে কীনা এটা দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে- একজন সুস্থ মা একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পারে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন। সুন্দর আগামী প্রজন্ম পেতে হলে মা ও তার স্বামীকে কাউন্সিলিং করাতে হবে।
তাসমিমা হোসেন বলেন, ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি নারী জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করেন। এতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার নারী সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। এতে করে মাঠ পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন পর্ব শুরু হয়।
তিনি বলেন, মায়েদেরও ক্ষমতার প্রয়োজন। আমাদের মা-দাদিদের দেখেছি তারা মানিয়ে চলেছেন। আসলে মেয়েরা সব কিছু ম্যানেজ তরে চলে। বাল্যবিবাহ এবং প্রাপ্তবয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েরা স্বামীর ঘরে এসে সন্তান জন্ম দেয়া, লালন পালন, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি সবই কোন প্রকার শিক্ষা ছাড়াই মানিয়ে নেয়। মেয়েরা সবচেয়ে ভালো ম্যানেজার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এএইচএম নোমান বলেন, আমরা বিশ্ব মা দিবসে দেশীয় চিন্তায় ২০০৫ সালে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মা দিবস উদযাপন শুরু করি। এই কর্মসূচি এখন সরকার বাস্তবায়ন করছে। ডরপ উদ্ভাবিত সোস্যাল এসিসট্যান্স প্রোগ্রাম ফর নন এ্যাসেসটার্স- ‘স্বপ্ন’ প্যাকেজ নামক উন্নয়ন মডেলটি সরকার দেশের সাতটি বিভাগের ১০টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করেছে।
কাজী রোজী বলেন, বর্তমানে সময়ে দেখা যাচ্ছে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হচ্ছেন মা ও শিশুরা। এমন দৃশ্য আমরা দেখতে চাই না। আমাদের মায়েরা দাঁড়িয়ে গেলেই সোনার বাংলা হবে। সকল মায়েদের জন্য ভালোবাসা।
বেগম নাসিমা ফেরদৌসি বলেন, মায়েদের কথা ভেবে সরকার অনেক নীতিমালা ও কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে এসব নীতিমালা কিংবা আইন করে মানুষের মনের অন্ধকার তাড়ানো সম্ভব নয়। সরকারকে সহায়তার লক্ষে সকলকে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে হবে।
বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি বলেন, মা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান তখন যেনো সামাজিক বোঝা হয়ে না যান- বিষয়টির ওপর নজর দিতে হবে। সন্তান যেনো মাদকমুক্ত, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকে-এটা খেয়াল রাখতে হবে।
দৈনিক ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার রাবেয়া বেবীর সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগম, পলিসি সাপোর্ট ইউনিটের টিম লিডার ডা. আব্দুস সবুর, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি ফাতেমা বেগম, লাইট হাউজের নির্বাহী পরিচালক মো. হারুন আর রশিদ, নারী পক্ষের সহ-প্রকল্প সমন্বয়কারী সামিয়া আফরীন, মা সংসদ কালিগঞ্জের স্পিকার অর্পিতা রানী, গণমাধ্যম কর্মী তাহমিনা আক্তার শিল্পি, আরডিসির নির্বাহী প্রধান সেলিনা আক্তার, কালিগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান শর্মিলা রানী দাস। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, সমাজে সকল মায়ের অবস্থান এক নয়। শ্রেণি বৈষম্যের বাইরেও মায়ের অবস্থানের ভিন্নতা রয়েছে। কর্মজীবী মায়েদের সংসারের কাজ এবং কর্মস্থলের কাজ নিয়ে উভয় সংকটে পড়তে হয়। কর্মজীবী মায়েদের ফ্যামিলি ও কাজের ক্রাইসিসের সমন্বয় করতে হবে।
ইত্তেফাক/এমআই