চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে নাহার এগ্রো গ্রুপের পোল্ট্রি বর্জ্যের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষ। এলাকা ছাড়ার কথা ভাবছেন অনেকেই। স্থানীয় প্রশাসন, নাহার এগ্রো গ্রুপের কর্মকর্তাদের অভিযোগ দিয়ে এবং একাধিকবার মানববন্ধন করার পরও কারো পক্ষ থেকেই নেওয়া হয়নি কার্যকর পদক্ষেপ। এদিকে নাহার গ্রুপ এলাকাবাসীর অভিযোগ কর্ণপাত না করেই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় কেটে একের পর এক পোল্ট্রি শেড গড়ে তুলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষকের কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় পাহাড় কেটে সমতল করা হলেও বন বিভাগ তা দেখেও দেখছে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, মিরসরাইয়ের করেরহাট ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ঘেড়ামারা এলাকায় প্রায় ৭ বছর পূর্বে নাহার এগ্রো গ্রুপ ‘মিরসরাই পোল্ট্রি লেয়ার লিমিটেড’ নামে একটি মুরগির ডিম এবং বাচ্চা উত্পাদন কারখানা স্থাপন করে। বর্তমানে ৩টি শেডে ১ লাখ ২০ হাজার মুরগি এবং বাচ্চা ( পেরেন্টস লেয়ার) উত্পাদিত হয়। কারখানার বর্জ্য দিনে কম ছাড়া হলেও রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে পাশের লক্ষ্মীছড়ায় (বারমাসি খাল) ফেলা হয়।
এলাকাবাসী জানান, বর্জ্য ছাড়ার সময় দুর্গন্ধে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। খাওয়ার সময় প্রতিদিনই তাদের বমি হয়। শিশুরা শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও বৃদ্ধরা হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দুর্গন্ধের কারণে ৪ ও ৫ নং ওয়ার্ডের ৫ শতাধিক পরিবারের এলাকায় বসবাস করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ত্রিশোর্ধ এক গৃহিণী বলেন, ‘কারখানায় মৃত মুরগি ও পচা ডিম পোড়ানোর গন্ধ আমাদের অতিষ্ঠ করে তোলে। সারাদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখি। এ যন্ত্রণার কারণে শেষ পর্যন্ত বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবছি।’
দেখা গেছে, এই পোল্ট্রির ১৯ একর জায়গার বেশির ভাগই পাহাড়। পাহাড় কেটেই চলছে চতুর্থ শেডের নির্মাণ কাজ। পাহাড় কাটার জন্য পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতিপত্র থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও উপস্থিত কেউই তা দেখাতে পারেননি। পাহাড় কাটার ফলে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে পাশের পাহাড়গুলোতে। কারখানার ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে ৭ হাজার ফুট গভীর বায়োগ্যাস প্লান্ট। প্লান্টের পাশেই প্রবাহিত লক্ষ্মীছড়ায় বস্তা ভর্তি করে ফেলা হচ্ছে মুরগির বর্জ্য। এছাড়াও প্লান্টে ব্যবহার শেষে বের হওয়া বর্জ্যও ফেলা হয় ছড়ায়। এতে করে দূষিত হচ্ছে বারমাসি ছড়ার পানি। ফলে মারা যাচ্ছে খালে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে এলাকায় সবজির ফলনও কমে গেছে।
কারখানার সুপারভাইজার রোকন উদ্দিন বলেন, মরা মুরগি পোড়ানোর জন্য গ্যাসের নির্দিষ্ট চুল্লি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কারখানার বর্জ্য কারখানার নিজস্ব বায়োগ্যাস প্লান্টে ব্যবহার করা হয়। লক্ষ্মীছড়ায় বর্জ্য ফেলার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।
পোল্ট্রিটির কয়েকশ গজ দূরেই অবস্থিত চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষকের কার্যালয়। এ ব্যাপারে সহকারী বন সংরক্ষক আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, পাহাড় কাটার বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে এ বিষয়ে তিনি খোঁজখবর নেবেন।
করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে বলেন, নাহার গ্রুপের কর্মকর্তারা বলেছিল বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে তারা বর্জ্য অপসারণ করবেন। কিন্তু রাতের বেলায় তাদের বর্জ্যের গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। তিনিও এ সমস্যার আশু সমাধান চান।
জানতে চাইলে মিরসরাই পোল্ট্রি লেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মো. আলাউদ্দিন তাদের প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য অপসারণের সময় জনদুর্ভোগের কথা অস্বীকার করেন। পাহাড় কাটার বিষয়ে প্রথমে অনুমতি নেওয়ার কথা বললেও পরবর্তীতে তিনি পাহাড় কাটার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক শেখ নাজমুল হুদা বলেন, ঘেড়ামারা এলাকায় নাহার এগ্রোর পাহাড় কাটার বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর অবগত নয়। ওই এলাকায় পাহাড় কাটার বিষয়ে তাদের কোনো অনুমোদন নেই বলেও তিনি জানান।
ইত্তেফাক/নূহু