বাংলা বানানের নিয়ম-কানুন

রিজিয়া পারভীন, সহকারী শিক্ষক (বাংলা )

কাপাসিয়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়

গাজীপুর

সুপ্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, বাংলা, বাঙালির মাতৃভাষা। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে  এই ভাষার মান-মর্যাদা অর্জিত হলেও দেশের সর্বত্র চলছে ভুল বানানের ছড়াছড়ি। যেমন তোমরা অনেকেই ‘ভুল’ শব্দটি লিখতে গিয়ে ‘ভূল’ লিখে থাক। এটা আমাদের অসচেতনতার জন্য হয়ে থাকে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে যদি আমরা দেখে দেখে পড়ার সময় বিশেষ নজর দিয়ে থাকি তাহলে এরকম ভুল থেকে আমরা সহজেই বাঁচতে পারি। কেননা ভুল বানান দেখতে অসুন্দর ও বেমানান লাগে।

প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মে আজ আমরা কয়েকটি নিয়ম দেখবো। তাহলে এসো আমরা জেনে নেই প্রমিত ভাষারীতি কী?

প্রমিত ভাষারীতি:সৃষ্টির কালে বাংলা ভাষার আজকের এই রূপ ছিলো না। বিভিন্ন ভাষারীতি কালক্রমে পরিমার্জিত হয়ে গ্রহণযোগ্য একটি রূপ লাভ করেছে। এই ভাষারীতি সাধারণত শিক্ষিত লোকের কথাবার্তা ও নিত্য ব্যবহারে আরও আকর্ষণীয় হয়। ভাষাও যে শ্রমসাধ্য, প্রযত্নলব্ধ এবং শেখার কোনো বিষয় প্রমিত ভাষারীতি তার প্রমাণ। এক কথায়, ভাষার সর্বজনগ্রাহ্য ও সমকালের সর্বোচ্চ মার্জিত রূপকেই প্রমিত ভাষারীতি বলে।

প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম নিম্নরূপ:

১। তত্সম অর্থাত্ বাংলা ভাষায় ব্যবহূত অবিকৃত সংস্কৃত শব্দের বানান যথাযথ ও অপরিবর্তিত থাকবে। কারণ এইসব শব্দের বানান  ও ব্যাকরণগত প্রকরণ ও পদ্ধতি নির্দিষ্ট রয়েছে।

২।  তবে যে-সব  তত্সম শব্দে ই, ঈ বা উ, ঊ উভয় শুদ্ধ সেই সব শব্দে কেবল ই বা উ এবং তার- কারচিহ্ন ই-কার, উ-কার ব্যবহূত হবে। যেমন: কিংবদন্তি, খঞ্জনি, চিত্কার, ধমনি, ধূলি, পঞ্জি, পদবি, ভঙ্গি, মসি, মঞ্জরি, লহরি, সরণি, সূচিপত্র, উর্ণা, ঊষা ইত্যাদি।

৩। রেফ- এর পরে ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব উচ্চারণ হবে না। যেমন: অর্চনা, অর্থ, অর্জন, অর্ধ, কর্দম, কর্তন, কর্ম, কার্য, গর্জন, মূর্ছা, কার্তিক, বার্ধক্য, বার্তা, সূর্য ইত্যাদি।

৪। ক খ গ ঘ পরে থাকলে পদের অন্তস্থিত ম স্থানে অনুস্বার (ং) লেখা যাবে। যেমন: অহংকার, ভয়ংকর, সংগীত, শুভংকর, হূদয়ংগম, সংঘটন। বিকল্পে ঙ লেখা যাবে। ক্ষ - এর পূর্বে সর্বত্র ঙ হবে। যেমন: আকাঙ্ক্ষা, অনাকাঙি্ক্ষত।

৫। সকল অ-তত্সম অর্থাত্ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র শব্দে কেবল ই এবং উ এবং এদের-কার চিহ্ন ‘ই-কার’ ও ‘উ-কার’ ব্যবহূত হবে। এমনকি স্ত্রীবাচক ও জাতিবাচক ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। যেমন: গাড়ি, বাড়ি, শাড়ি, দাঁড়ি, চুরি, ভারি, তরকারি, বোমাবাজি, দাবি, হাতি, বেশি, খুশি, হিজরি, আরবি, ফারসি, ফরাসি, বাঙালি, ইংরেজি, জাপানি, জার্মানি, ইরানি, হিন্দি, সিন্ধি, ফিরিঙ্গি, সিঙ্গিঁ, ছুরি, টুপি, সরকারি, মালি, পাগলামি, পাগলি, দিঘি, কেরামতি, রেশমি, পশমি, পাখি, ফরিয়াদি, আসামি, বে-আইনি, ছড়ি, কুমির, নানি, দাদি, বিবি, মামি, চাচি, মাসি, পিসি, দিদি, বুড়ি, ছুঁড়ি, নিচে, নিচু, ইমান, চুন, পুব, ভুখা, মুলা, পুজো, দুর্গা, দুর্যোগ, উনিশ, উনচল্লিশ ইত্যাদি।

## অনুরূপভাবে ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ই-কার হবে। যেমন: খেয়ালি, বর্ণালি, মিতালি, সোনালি, হেঁয়ালি।

## তবে কোনো কোনো স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে ঈ-কার  দেয়া যেতে পারে। যেমন: রানী, পরী, গাভী।

## সর্বনাম পদরূপে এবং বিশেষণ ও ক্রিয়া-বিশেষণ পদরূপে ‘কী, শব্দটি ঈ-কার দিয়ে লেখা হবে। যেমন: কী করছো? কী পড়ছো? কী জানি? এটা কী বই? কী করে যাব? কী আনন্দ! কী দুরাশা!

আবার অন্য ক্ষেত্রে অব্যয় পদরূপে ই-কার দিয়ে ‘কি’ শব্দটি লেখা হবে। যেমন: তুমিও কি যাবে? সে কি এসেছিল? কি বাংলা কি ইংরেজি উভয় ভাষায় তিনি পারদর্শী।

আবার পদাশ্রিত নির্দেশকটিতে ই-কার হবে। যেমন: ছেলেটি, লোকটি, বইটি ।

(সূত্র: বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি -৮ম শ্রেণি, বাংলাদেশের ভাষা পরিকল্পনা পর্যালোচনা ও প্রস্তাব  জাহাঙ্গীর আলম জাহিদ)

আরও জানতে চোখ রাখো ফেইসবুক পেজে “বাংলা বানানের নিয়ম-কানুন” গ্রুপে । ও  দৈনিক ইত্তেফাক-এর অনুশীলন পাতায় আমরা আছি তোমাদের সাথে নতুন নতুন বানান নিয়ে।ধ