মামলার বহর বাড়ছে গাজীপুরের মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নানের। গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, হত্যা চেষ্টা, মোবাইল ফোন ছিনতাই-এমন কোনো অভিযোগ নেই যে অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। বর্তমানে তার গলায় ৩০টি মামলা। কারাগারে বসে আটক হন ২১ মামলায়। মেয়র পদ থেকে দুই দফা তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। সর্বশেষ বরখাস্তের আদেশ হাইকোর্ট স্থগিত করলেও এক মাস হয়ে গেলেও পাননি দায়িত্ব। এর মধ্যে রবিবার ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুদক করেছে আর একটি মামলা।
এক মামলা মাথায় নিয়ে ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম কারাগারে যান মেয়র মান্নান। কারাগারে থাকাবস্থায়ই তার বিরুদ্ধে আরো ২১টি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। প্রথম দফায় সর্বমোট ২২টি মামলায় জামিন পাওয়ার দেড় মাসের মাথায় ফের গ্রেফতার হন তিনি। ২৮ মামলায় দ্বিতীয় দফা জামিন পাওয়ার পর চাঁদাবাজির আরেক মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। এই মামলায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের ঘটনার ঘটে ২০১৪ সালে। আর মামলা হয় দুই বছর পর। যেদিন (গত বছরের ২৪ নভেম্বর) আপিল বিভাগ সর্বশেষ মামলায় মেয়র মান্নানকে জামিন দেন সেদিনই তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়। পুলিশ গাজীপুরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাকে গ্রেফতারের আবেদন জানায়। মেয়র মান্নানকে যেসব মামলায় আটক দেখানো হয়েছে তার অধিকাংশ মামলার এজাহারেই তার নাম নেই। উচ্চ আদালতে একেকটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর পুলিশ নতুন নতুন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে। কোনো মামলায়ই নিম্ন আদালত থেকে জামিন পাননি তিনি।
সব মামলায়ই জামিন নিতে হয়েছে হাইকোর্ট থেকে। ৭টি মামলায় আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে। হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল বিভাগ জামিন স্থগিতের আবেদন খারিজ করে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখে। প্রথম দফা এক বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের ২ মার্চ কারামুক্তি পান মেয়র মান্নান। কারাগারে থাকাবস্থায় মেয়র মান্নানকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
এই বরখাস্তের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। পরে ওই বরখাস্তের আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। পরে তা বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এরপর মেয়র হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পূর্ব মুহূর্তে গত বছরের ১৫ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর ও টঙ্গী থানায় আবারো নাশকতার তিনটি মামলা করে পুলিশ। দেড় মাসের মাথায় আবার কারাগারে যেতে হয় তাকে। দ্বিতীয় দফা মুক্তি পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলার বহরে যুক্ত হয় আরো ৮টি মামলা। এই ৮টি মামলার মধ্যে ৭টি মামলায় গত ২৪ নভেম্বর তিনি সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ থেকে জামিন পান। এই জামিন পাওয়ার দিনই অতি সংগোপনে গত ২৪ নভেম্বরই তার বিরুদ্ধে দায়ের হয় সর্বশেষ চাঁদাবাজি ও প্রাণে হত্যার চেষ্টার মামলা। ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
ওই মামলার বাদী রমিজউদ্দিনের অভিযোগ নিজ জমিতে শিল্প-কারখানা স্থাপনের অনুমতির জন্য তিনি মেয়রের কাছে গেলে মেয়র তার কাছে দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাদা না দেওয়ায় মেয়র ও মেয়রের লোকজন মেয়র কার্যালয়েই বাদীকে মারধর করেন এবং মোবাইল ছিনতাই করে নিয়ে যান। রমিজউদ্দিনের কথিত ঘটনাটি ঘটে মেয়র মান্নান গত বছরের নভেম্বরে যখন উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান তার দুই বছর আগে। কিন্তু তিনি মামলা করেন মেয়র মান্নান যখন সর্বশেষ মামলায় জামিন পান তার পরে।
নিজ জমিতে শিল্প-কারখানা করার কথা বললেও তার নিজের কোনো জমি নেই। এ প্রসঙ্গে গাজীপুর জেলা বারের সিনিয়র আইনজীবী ড. মোঃ শহীদুজ্জামান বলেন, মেয়র মান্নানের বিরুদ্ধে সব মামলাই হয়রানিমূলক। তিনি নিষ্ঠুর রাজনীতির শিকার।
মেয়র মান্নানকে দু’দফা তার পদ থেকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রথম দফায় বরখাস্ত হয় ২০১৫ সালের ১৯ আগস্ট। হাইকোর্ট এই বরখাস্তের আদেশ স্থগিত ঘোষণা করলেও দায়িত্ব ফিরে পাননি তিনি। ২০১৬ সালের ২ মার্চ কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও দেড় মাসের মাথায় তিনটি নাশকতার মামলায় তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল তাকে পুনরায় বরখাস্ত করা হয়। এক বছর আইনি লড়াই চালিয়ে গত ১৩ এপ্রিল হাইকোর্ট তার দ্বিতীয় দফা বরখাস্তের আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সরকার আপিল বিভাগে আবেদন করলে চেম্বার জজ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত ঘোষণা করেননি। কিন্তু তারপরেও মেয়রের দায়িত্ব ফিরে পাচ্ছেন না তিনি।
তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ আবু হানিফ বলেন, মামলাটি বিচারাধীন আছে এই যুক্তি দেখিয়ে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না। গত রবিবার মামলাটি শুনানির জন্য আমরা আপিল বিভাগে আবেদন করেছি। বৃহস্পতিবার এ ব্যাপারে শুনানির জন্য ধার্য রয়েছে। এরই মধ্যে গতকালই দুদক তার বিরুদ্ধে দায়ের করে আরেকটি মামলা। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও পদ্ধতিগত ত্রুটি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মেয়র মান্নানের আইনজীবীদের আশঙ্কা আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখলে পুনরায় দুদকের মামলায় তাকে গ্রেফতার এবং বরখাস্ত করা হবে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, মেয়র মান্নানকে নিয়ে যা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ অমানবিক একটি আচরণ। তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। তার মতো একজন জনপ্রতিনিধিকে যেনতেন মামলায় প্রাথমিক কোনো তদন্ত ছাড়াই পুলিশ বারেবারে গ্রেফতার করেছে। সম্পূর্ণ বিষয়টি একটি বিচারিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে সুয়োমটো ভূমিকা নিতে পারে।
ইত্তেফাক/নূহু