বিচার বিভাগের ওপর আস্থা অনেক বেড়েছে

 
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ৯০ ভাগের ওপর বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অন্য যে কোন প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিচার বিভাগ শতগুণ ভালো অবস্থানে রয়েছে।
 
গতকাল বুধবার বিচারক অপসারণ সংক্রান্ত আপিল আবেদনের শুনানিকালে অ্যাটর্নি জেনারেলের এক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘কোর্ট সম্পর্কে মানুষের কি ধারনা সে বিষয়ে একটা গণশুনানি নেওয়া হোক।’ তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আগে কি ছিল জানি না। কিন্তু বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।’
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, কয়েকদিন আগে বাঁশখালী চৌকি আদালত পরিদর্শনে গিয়েছিলাম, সেখানে যে সংখ্যক বিচার প্রার্থী বিচারের জন্য আদালতে ভিড় করেছেন তা অবাক করার মত। বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আছে বলেই তারা আদালতে যাচ্ছেন। এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি আপনার সব কথার সাথে একমত পোষণ করতে পারছি না। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি একমত পোষণ করতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক। এ আদালতে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। এখানে দক্ষ ও যোগ্য বিচারক নিয়োগ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গত দেড় বছরে কোনো বিচারক নিয়োগ করা হলো না। আপনারা যা চাচ্ছেন সেটি হলে তো এরকম ধারনা হবেই।
 
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চে ওই শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি এবং সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক হয়। অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ভারত ও পাকিস্তানে আদালতের রায় নিয়ে বিরূপ কোন আলোচনা হয় না। কিন্তু আমাদের এখানে কি হয় সেটাও দেখুন? তিনি বলেন, ভারতের বিচারক নিয়োগের কলেজিয়াম প্রথা বাতিল করে সরকার আইন করেছিল। সেটিও বাতিল করে দেয় সেদেশের সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের ওই রায় নিয়ে সংসদে কোনো সমালোচনা হয়নি। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলো সুপ্রিম কোর্ট। সে দেশের সংসদ ও রাজনীতিবিদরা মাথা নিচু করে তা মেনে নিয়েছে। যে পাকিস্তানে সুবিধাভোগী সরকার থেকেছে বেশিরভাগ সেময়, সে দেশেরই সুপ্রিম কোর্ট কি রকম ভূমিকা রাখছে দেখুন?
 
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অবৈধ। পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় সেটা বাতিল করা হলে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হতো। তত্কালীন আইনমন্ত্রী যিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হন তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের এক ধরণের সুবিধা দিতেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে বহাল রেখেই পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছেন। এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, তার মন্ত্রিত্বকালীন সময়ে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে মধুর সম্পর্ক ছিল। আর সুপ্রিম কোর্টকে আন্ডারমাইন (খাটো) করবেন না। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের নিয়ে এত কথা বলছেন? তাহলে কেন এ প্রথা সংবিধানে রেখেছেন, বাতিল করেননি? একটি শব্দ ব্যবহারের আগে বুঝেশুনে করবেন। ঢিল মারলে পাটকেল পরবে, এটাও মনে রাখবেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, যে মন্ত্রীর কথা বলছেন যুদ্ধাপরাধ বিচার ও ট্রাইব্যুনাল গঠনে তার অবদান রয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মেনিফেস্টোতে ছিল। প্রধানমন্ত্রী মূখ্য ভূমিকা না নিলে এই বিচার হতো না। প্রধান বিচারপতি বলেন, এখানে প্রধানমন্ত্রীকে কেন টেনে আনছেন?
 
শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমরা মূল সংবিধানে ফিরে যেতে চাই। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান সাংবিধানিক ইতিহাসে লজ্জা। ‘মার্শাল ল’ এর মাধ্যমে যতখানি সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে ততখানি বাদ দিতে চাই। প্রধান বিচারপতি বলেন, জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন আসবে তখন আমরা সংবিধানের ‘এ-টু-জেড’ পর্যন্ত দেখব। সেভাবেই সংবিধানকে ব্যাখ্যা করব।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, পৃথিবীর একমাত্র সভ্য দেশ ইংল্যান্ড। যে দেশে অলিখিত সংবিধানের ভিত্তিতে নির্বাচন, গণতন্ত্র ও ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা ঘটে থাকে। চুল পরিমাণ এদিক-সেদিক হয় না। বেক্সিট ইস্যুতে হেরে একজন প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের চিন্তা-চেতনা ও মন মানসিকতা কল্পনা করুন।
 
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ইংল্যান্ডকে সভ্য দেশ বলা ঠিক নয়। তাদের ইতিহাসই তো লুণ্ঠনের। প্রধান বিচারপতি বলেন, ইংল্যান্ড লুণ্ঠন করেছে, আমেরিকা করে যাচ্ছে। কিন্তু আমি সভ্য দেশ বলতে সে দেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন, নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার যে পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বলেছি।
 
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সংবিধানকে ঘিরেই আপনাদের ও আমাদের সমস্ত পান্ডিত্য। তবে বাহাত্তরের সংবিধানে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। অদক্ষ ও বিচারকের অসদাচরণের বিষয়টিও দেখতে হবে। এ পর্যায়ে বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, তাহলে কি বিচার বিভাগের বিকাশ ঘটবে না? জুডিশিয়াল রিভিউ থাকবে না? তাহলে জুডিশিয়াল রিভিউ উঠিয়ে দিন।
 
এরপর শুনানিতে রিটকারীর পক্ষে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, একটি সদ্য স্বাধীন দেশে যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল, তখন বিচারকদের অপসারণের বিষয়টি সংসদের হাতে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৯৭৪ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু  নিজেই অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে ফিরিয়ে নেন। এরপর বিচারপতি অপসারণ পদ্ধতিটাই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। মনজিল মোরসেদ বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্বে দীর্ঘ দেড় বছর বিশেষ কমিটি এ বিষয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধন করে সরকার। এই সংশোধনী প্রস্তাবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিলের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাবও নাকচ করে দেন।
 
মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার কারণে সংসদে জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটছে না। এই অনুচ্ছেদ থাকার কারণে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাদের মতামত তুলে ধরতে পারেন না। ভয় একটাই, দলের বিরুদ্ধে মত গেলে সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। তিনি বলেন, বিভিন্ন দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা দুর্বল হয়েছে। আগে তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে কেন্দ্রে পদ পেত। কিন্তু এখন ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এ পর্যায়ে বিচারপতি ওয়াহহাব মিঞা বলেন, আগে তো শতকরা ৯০ ভাগ সংসদ সদস্য ছিলো আইনজীবী পেশার। এখন সেটি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের মত দেশের পার্লামেন্টে ৮০ ভাগ সংসদ সদস্য ‘ল ব্যাকগ্রাউন্ডের’। তারা সবসময় আইন নিয়ে চর্চা করে এবং মতামত দিয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে ওই ধরনের সংসদ সদস্য কতজন আছেন? যদি থাকত তাহলে ‘ক্লিনিক্যাল ল’ এর চর্চা হত। তিনি বলেন, আমাদের এখানে আইন কমিশন আছে। তাদের পরামর্শ নেওয়া হয় না। কাজও নেই। অনেকটা লোক দেখানোর জন্যই কমিশন রাখা হয়েছে। কিন্তু ভারতসহ অন্যান্য দেশে আইন কমিশন আইন সংশোধনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ মত দিচ্ছে।
 
রিটকারী পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্যের পর অ্যামিকাসকিউরি হিসাবে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। তিনি লিখিত বক্তব্য আদালতে পাঠ করেন।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর