নূতন মাসের শুরুতে ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি নূতন এক মোড় লইয়াছে। গত সোমবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত হইতে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হুয়ান গুইদোর পার্লামেন্টারি দায়মুক্তি প্রত্যাহার করিয়া লইবার জন্য আইনসভার প্রতি নির্দেশ জারি করে। পরের দিন আদালতের নির্দেশ মান্য করিয়া কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে গুইদোর দায়মুক্তি প্রত্যাহার করা হয়। এমতাবস্থায়, সংবিধান অমান্য করিয়া নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণার দায়ে গুইদোকে বিচারের মুখোমুখি করা কিংবা গ্রেফতারের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকিবে না। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করিয়া তদন্তের অধীনে থাকা অবস্থায় বিদেশ গমন, রাজপথে সহিংসতা সৃষ্টি এবং বিদেশ হইতে অবৈধ অর্থ সংগ্রহের দায়েও গুইদো অভিযুক্ত হইতে পারেন বলিয়া মনে করা হইতেছে। বিচার বিভাগ ও আইন সভার সর্বশেষ উদ্যোগের মধ্য দিয়া ভেনিজুয়েলার অবনতিশীল পরিস্থিতির উপরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হইতে যাইতেছে বলিয়া কোনো কোনো আশাবাদী বিশ্লেষক মনে করিতেছেন। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মনে হয় যে, গুইদোকে সমর্থনকারী শক্তিশালী দেশগুলি হাত গুটাইয়া বসিয়া থাকিবে না। উল্লেখ্য, গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার পদে থাকা অবস্থায় নিজেকে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে ঘোষণা করেন গুইদো। ২০১৭ সালে কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি গঠিত হইবার পরে মূলত অলঙ্কারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বাতিল হইবার পরপরই নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন গুইদো। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির এই সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ আদালত অর্থাত্ সুপ্রিম ট্রাইব্যুনাল অফ জাস্টিসে প্রত্যাখ্যাত হইলেও, প্রেসিডেন্ট পদের দাবি ছাড়েন নাই গুইদো।
গুইদোর এহেন শক্তিমত্তার উত্স হইতেছে আমেরিকাসহ ইউরোপের অনেকগুলি শক্তিশালী দেশ। এই দেশগুলি নয়া-ভেনিজুয়েলার প্রতিষ্ঠাতা হুগো শ্যাভেজের আমল হইতেই ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জারি রাখিয়াছে। এই ধারাবাহিকতায়, বিশেষ করিয়া আমেরিকা যেকোনো মূল্যেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করিতে বদ্ধপরিকর। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে অনেকদিন ধরিয়াই নানা রকমের অবরোধের মধ্যে রাখিয়া ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিকে ধসাইয়া দেওয়ার চেষ্টা চলিতেছে। স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট গুইদোর পক্ষে সোচ্চার সমর্থনকে এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবেই ধরা যাইতেছে। এইক্ষেত্রে পরাক্রমশালী পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলিও একচেটিয়াভাবে গুইদোর পক্ষাবলম্বন করিয়া চলিয়াছে।
ভেনিজুয়েলার প্রতি এত ক্রোধের কী কারণ থাকিতে পারে? কারণ হইতেছে এই যে, শ্যাভেজ তাঁহার দেশের সম্পদকে বিদেশি শক্তি ও বহুজাতিকগুলির খপ্পরমুক্ত করিয়া সাধারণ জনগণের মধ্যে বণ্টন করিবার জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছিলেন। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পরে তাঁহার অনুসারী মাদুরো কিছুটা দুর্বলভাবে হইলেও একই পন্থা অবলম্বন করেন। এইখানেই বাধিয়াছে গোল। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে গত কয়েকমাস যাবত্ ভেনিজুয়েলার ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যসংকট ও মানুষজনের দেশত্যাগের কাহিনিই শোনানো হইতেছে। কিন্তু শ্যাভেজ-পূর্ব যুগের ৮০ শতাংশ হইতে হ্রাস পাইয়া বর্তমানে দেশটির দারিদ্র্যের হার যে ২৭ শতাংশে আসিয়া ঠেকিয়াছে তাহা কে বলিবে? মাদুরোর সরকার যে বৈদেশিক ঋণের ছলনা-জাল হইতে দেশকে মুক্ত করিবার জন্য গত পাঁচ বত্সরে ৭০ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করিয়া স্বাবলম্বী হইবার চেষ্টা করিয়াছেন সেই খবরও পশ্চিমের প্রভাবশালী মিডিয়াতে অনুপস্থিত। মাদুরো যদি শেষাবধি গদি রক্ষা করিতে পারেন তবে তাহা হইবে অন্য অনেক দেশের জন্যই অনুপ্রেরণাদায়ক।