গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী আজ


গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ পহেলা জুন। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক,  প্রবাদপ্রতীম এই ব্যক্তিত্ব দেশের সাংবাদিকতাকে একটানে বদলে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিকতার কিংবদন্তি পুরুষ, আধুনিক সংবাদপত্রের রূপকার, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা।

‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ আর ‘রঙ্গমঞ্চ’ শিরোনামে কলাম লিখে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলেন মানিক মিয়া। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা সহজ ভাষায় তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেন। নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে তিনি কখনো আপস করেননি। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তাঁর সেই সংগ্রামী জীবনের প্রধান হাতিয়ার।

মানুষের প্রত্যাশা, বেদনাকে জোরালোভাবে তুলে ধরবার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে জীবনব্যাপী তিনি এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৬৯ সালের এই দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ক্ষণজন্মা এই সাংবাদিক। ভাগ্য-বিড়ম্বিত বাঙালি জাতির জীবন-সংগ্রাম, অস্তিত্ব-আত্মমর্যাদা এবং আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রেরণা প্রদানকারী শক্তির উত্স হয়ে উঠেছিলেন তিনি এবং তার প্রকাশিত সংবাদপত্র ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। তাঁর সংগ্রামদীপ্ত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাংলার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধ জড়িয়ে ছিল।

ইত্তেফাক ছিল রাজনৈতিক পত্রিকা। রাজনৈতিক দলের মুখপত্র — বর্তমান সময়ে এসে এমন কথা কেউ কেউ বলতে চান। ইত্তেফাক সবসময় মনে করেছে, সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের কথা বলা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। ইত্তেফাক পূর্ব পাকিস্তানে যে ভূমিকা পালন করেছিল তা ছিল সময়ের দাবি। দৈনিক ইত্তেফাক ও মানিক মিয়ার অবস্থান এবং আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ছিল এক ও অভিন্ন। সে কারণে অনেকে সেই অবস্থানের সমালোচনা করেন। কিন্তু ইত্তেফাক তথাকথিত নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করেনি। মানুষের মুক্তির পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে জাতির প্রতিটি ক্রান্তিকালে। মানিক মিয়া ছিলেন তার কাণ্ডারি।

তিনি ছিলেন উদার গণতন্ত্রের ধারক। একজন রাজনীতিমনস্ক সাংবাদিক হয়েও তাঁর রাজনৈতিক কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না, ছিল না ব্যক্তিগত কোনো লোভ। এ কারণেই সত্য কথা বলার সাহস দেখাতে পারতেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং সরকারের অসহযোগিতাকে মোকাবিলা করে, নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে তাকে মানুষের অধিকারের কথা বলতে হয়েছে।

তিনি যেমন বাংলা সাংবাদিকতা জগতে পথ প্রদর্শক, তেমনই রাজনীতিতেও। রাজনৈতিক জগতে তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল মানিক মিয়ার।

এ দেশে সাংবাদিকতার জগতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া একটি অবিস্মরণীয় নাম। ‘মোসাফির’ শিরোনামে তাঁর ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে নির্ভীক সত্য ভাষণ, অনন্য রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা এবং গণমানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বাংলার মানুষের হূদয়ে তিনি অবিনশ্বর হয়ে রয়েছেন। মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে শুধুমাত্র একজন সাংবাদিক ছিলেন না। বরং সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার আপোষহীন মনোভাবের কারণে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি শাসকরা বারবার তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের ওপর বারবার নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। এক সময়ে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের সামরিক শাসক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে সময়ে সরকারের সঙ্গে আপোষ করলে তিনি ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এবং তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংবাদিক শ্রেণি জনমানুষের সংবাদপত্রের প্রতি যে বিশ্বাস তার সঙ্গে আপোষ করেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মুসলেম উদ্দিন মিয়া। শৈশবেই মানিক মিয়ার মা মারা যান। গ্রামের পূর্ব ভান্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষা জীবনের শুরু। সেখানে কিছুদিন পড়ার পর তিনি ভর্তি হন ভান্ডারিয়া হাই স্কুলে। ভান্ডারিয়া স্কুলে মানিক মিয়া অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর চলে যান পিরোজপুর জেলা সরকারি হাই স্কুলে। সেখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশনসহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন। পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে কর্মরত থাকাবস্থায় ১৯৩৭ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত গোয়ালদি গ্রামের অভিজাত পরিবারের খোন্দকার আবুল হাসান সাহেবের কন্যা মাজেদা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

এসময় তিনি তত্কালীন মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহ্?রাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের আহ্বানে চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি যোগ দেন তদানীন্তন বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগে বরিশাল জেলার সংযোগ অফিসার হিসেবে। কিছুদিন পর সে চাকরি ছেড়ে তিনি কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। এসময় ১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’-এর পরিচালনা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। এ পত্রিকার সাথে মানিক মিয়া মাত্র দেড় বছর যুক্ত ছিলেন। ’৪৭ এর দেশ বিভাগের পর কিছুকাল কলকাতায় অবস্থান করে মানিক মিয়া তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৪৯ সালে জন্ম নেয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের। ১৯৫১ সাল থেকে তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এ রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীকালে দৈনিক ইত্তেফাক আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে তিনি এক বছর জেল খাটেন। ১৯৬৬ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর ফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়। গণআন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাতটা থেকে মরহুমের আজিমপুর কবরস্থানের মাজারে কোরআনখানি ও বেলা ১০টায় মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে মরহুম মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেনের পক্ষ থেকে এতিমখানায় তবারক বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে। মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠ কন্যা মরহুমা আখতারুন্নাহার (বেবী) এর বাসভবনে বাদ এশা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর ১ আর কে মিশন রোডে মানিক মিয়া ফাউন্ডেশনের আয়োজনে বেলা সাড়ে তিনটায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

জাতীয় পার্টি-জেপি’র কর্মসূচি

জাতীয় পার্টি (জেপি) দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার আজিমপুর কবরস্থানে মাজার জিয়ারত ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং সকাল ১০টায় মাজার প্রঙ্গণে মিলাদ মাহফিল ও মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত। আগামীকাল শুক্রবার বিকাল ৪টায় ঢাকার ফার্মগেটস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে (কেআইবি) মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কর্মজীবনের উপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। বিশেষ অতিথি থাকবেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমানসহ দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। সভাপতিত্ব করবেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম।

জেপি’র বিবৃতি

জাতীয় পার্টির (জেপি) কেন্দ্রীয় কার্যনিবার্হী কমিটির পক্ষ হতে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিবৃতিতে মরহুমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালবাসা জ্ঞাপন করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়ক এবং স্বাধীন বাংলার অন্যতম স্বপ্নদষ্টা। তিনি সাংবাদিকতা করতেন এক মহান লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে। তার “মোসাফির” নামে লেখা ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ ছিল এদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্খা পূরণের পথ নির্দেশক। তিনি ছিলেন এদেশের সাংবাদিক জগতের প্রবাদ পুরুষ। তিনি কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন, মামলার আসামি হয়েছেন, “ইত্তেফাক” বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তবুও নীতির প্রশ্নে আপোষ করেননি।

আমাদের জাতীয় জীবনের এই ক্লান্তি লগ্নে মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অবিনাশী চেতনা থেকে আমরা নতুন প্রেরণা লাভ করতে পারি।  বিবৃতিতে দলের পক্ষ হতে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা এবং পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করা হয় যেন আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বেহেশত নসিব করেন।

ইত্তেফাক/নূহু