পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক গুম, হত্যা ও চাঁদাবাজি বেড়েই চলছে। পাহাড়ে অশান্তির নেপথ্যে রয়েছে এই তিনটি স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ। অপ্রতিরোধ্যভাবে চলা ব্যাপক চাদাঁবাজির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি বাঙ্গালিসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ অতিষ্ট হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাঝারি ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার, পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ জনগণ জানিয়েছেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর শুধু পার্বত্য তিনটি জেলা শহরের লোকজন কিছুটা নিরাপদে বসবাস করছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কি ধরনের নির্যাতন, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা অপকর্ম তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ চালিয়ে যাচ্ছে তা দেখার কেউ নেই। তারা এ ধরনের ঘটনাকে মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানায়।
পার্বত্য তিনটি জেলার প্রায় ১৬ লাখ লোকের জীবন এক প্রকার বিপন্ন হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর এ এলাকার সাধারণ মানুষ মনে করেছিল শান্তিতে বসবাস করা যাবে। বসবাসকারীদের মধ্যে বাঙালি ৪৯ ভাগ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ৫১ ভাগ বলে স্থানীয় প্রশাসন জানায়। বাস্তবে ঘটছে তার বিপরীত। তিনটি গ্রুপই লাভবান হচ্ছে। তারাই বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে পার্বত্য জেলায় গুম বেশ মিল রয়েছে। এক পক্ষ চাঁদাবাজি করতে গেলে অপর পক্ষ সহযোগিতা করে বলে জানা গেছে। কৃষিজীবীরা তাদের চাষাবাদের ফল, ফসল, সবজি, হাঁস-মুরগি বিক্রি করলেও নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়।
রাঙ্গামাটিতে জেএসএস ও ইউপিডিএফ প্রায় সমানতালে চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত। বিভিন্ন মতাদর্শে এ দু’দলের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিলেও চাদাবাজিসহ তাদের স্বার্থ সংশিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সরকার বিরোধী যে কোন আন্দোলনে একাত্নাভাবে আন্দোলন করে থাকে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছে রাঙ্গামাটির লংগদুর যুবলীগ নেতা মোটরবাইক চালক নয়ন। হত্যার প্রধান আসামি চাকমা সমপ্রদায়ের এক যুবক গ্রেফতার হয়েছে। দুজন এখনও পলাতক রয়েছে। গ্রেফতার হওয়া যুবকের কাছ থেকে নিহতের মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে। আটককৃত ওই যুবক জানিয়েছে, নিহত নয়নের মোটর সাইকেলও ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল তারা। এর আগে আরো ৮/১০টি মোটর বাইক চালককে এভাবে খুন করে মোটরবাইক ছিনতাই করেছে সন্ত্রাসীরা।
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলমান রয়েছে। অন্যদিকে গতকাল পাহাড়ি বাঙ্গালি নারীরা মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধন থেকে বলা হয়, গ্রেফতার ও হয়রানি আতঙ্কে পুরুষরা বাড়ি ছাড়া। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। ঢালাওভাবে যাতে হয়রানি না করা হয়।
রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে এই তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে পাহাড়ে বসবাসরতরা জিম্মি। তাদের কাছ থেকে কলার ছড়ি থেকে শুরু করে জমি বিক্রি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু থেকেই চাঁদা আদায় করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দের ১০ ভাগ টাকা চাঁদা হিসেবে তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপকে আগে প্রদান করেই বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে হয়। শুধু থানার ওসি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসপি, ডিসি ব্যতিত সবার কাছ থেকেই চাঁদা আদায় করে বলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে তিলকে তাল বানিয়ে একটি মহল ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে চায়। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লংগদুর ঘটনার নেপথ্যের সকল ঘটনা চিহূিত করা হয়েছে।
লামা (বান্দরবান) সংবাদদাতা মুহাম্মদ কামালুদ্দিন জানান, বান্দরবান পার্বত্য জেলায় জেএসএস ও ইউপিডিএফসহ কয়েকটি স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক গুম, হত্যা, অপহরণ এবং চাঁদাবাজির ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আলীকদম উপজেলায় জেএসএস’র সন্ত্রাসীরা গত বছরের মে মাসে তিন গরু ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে হত্যা করে।
বান্দরবান সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক মংপ্রু মার্মাকে জেএসএস’র স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গত বছর আগস্ট মাসে অপহরণ করে। প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও মংপ্রু মার্মা উদ্বার হয়নি।
লামা উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা মুসলিম পাড়ার গরু ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদকে স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এ বছর মার্চ মাসে অপহরণ করে। অনেক খোঁজাখুজির পরেও তারেকের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোন ক্রমেই বান্দরবানকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেয়া যাবে না। এ জন্যে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার সঞ্জিত রায় বলেন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে যা যা করা দরকার সেটাই করছে সরকার। লং দুতে যে এলাকার বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়েছে সেখানে সেনাবাহিনীর সহায়তায় প্রশাসন সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।
লং দু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল বারেক সরকার বলেন, আমরা বাঙালিসহ উভয়ে সবাবস্থানে আমরা বসবাস করে আসছি। সেখানে আমাদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। পাহাড়ের তিনটি সংগঠন তাদের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এই বিরোধ জিইয়ে রাখছে। এমন কোন অপকর্ম নেই তারা পাহাড়ে করেনি। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই।
পার্বত চট্টগ্রাম সমঅধিকারের নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, তিনটি স্বশস্ত্র গ্রুপ চায় না পাহাড়ি বাঙ্গালি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির মধ্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। নয়ন হত্যাকাণ্ডের পর লং দু এলাকায় যেখানে বাড়ি ঘরে আগুন দেয়া হয়েছে সেখানে রেড ক্রিসেন্টসহ মেডিক্যাল টিমও গেছে ক্ষতিগ্রস্থদের সেবা দিতে। তবে ওই গ্রুপ তাদের যেতে বাধা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক দৃষ্টি কাড়তেই এই অপকর্ম চালাচ্ছে তিনটি গ্রুপ। সেনাবাহিনী সরিয়ে নিলে অপরাধের রামরাজত্ব কায়েম করবে এবং পার্বত্য অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে চলবে। সেনাবাহিনী না থাকলে সেখানে ৪৯ ভাগ বাঙ্গালি জীবিত থাকত না বলে তিনি দাবি করেন।
ইত্তেফাক/আনিসুর