হাতিয়ার বিস্তীর্ণ জনপদ মেঘনা গর্ভে বিলীন

মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হচ্ছে জেলার বিচ্ছিন্ন উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ সমৃদ্ধ জনপদ। বর্ষা শুরু না হতেই শুরু হয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। প্রতিবছর নদী ভাঙনের কারণে হাতিয়ার প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে অসংখ্য মানুষ নতুন জেগে ওঠা চর ও ভেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। নদী ভাঙন হাতিয়ার নিত্যসঙ্গী। ১৯৬০ সাল থেকে হাতিয়া নদী ভাঙনের কবলে পড়ে। ১৯৬৮ সাল থেকে এ ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ সময় থেকে মেঘনা নদী হাতিয়ার পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর উপকূলে প্রচণ্ড প্রতাপে ভাঙতে থাকে। বর্তমানে হাতিয়ার আয়তন ২১০০ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৬০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত হাতিয়ার প্রায় ২৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মেঘনায় বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে হরণী-চানন্দী, সুখচর ও নলচিরা ইউনিয়ন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবে সমৃদ্ধ জনপদ আফাজিয়া বাজার এলাকা। বর্তমানে চরঈশ্বরের পূর্বাঞ্চল, চরকিংয়ের পশ্চিমাঞ্চল, তমরদ্দি ও সোনাদিয়া ইউনিয়নের কিছু অংশ ভাঙনের কবলে রয়েছে।

মেঘনায় হাতিয়ার উত্তরাঞ্চলের যতটুকু বিলীন হয়েছে তার পুরোটাই ছিল সমৃদ্ধ জনপদ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র এবং উন্নয়নের পটভূমি। এর মধ্যেই এ এলাকায় ভাঙনে বিলীন হয়েছে হাতিয়ার ঐতিহ্যবাহী শহর, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত আদালত ভবন, সরকারি হাসপাতাল, ডাকবাংলো, কারুকার্যমণ্ডিত প্রাচীন জামে মসজিদ এবং সরকারি কলেজসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীকালে নদী ভাঙনের কারণে হাতিয়া উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন অফিস-আদালত ওছখালীতে স্থানান্তর করা হয়। যা বর্তমানে হাতিয়া পৌরসভায় অবস্থিত।

নদী ভাঙনের কারণে হাতিয়ার মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক। হাতিয়ার তিনদিক থেকে ভাঙনের কারণে প্রতিবছর শতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপকহারে কৃষি জমি ভেঙে যাওয়ার কারণে হাতিয়ার অনেক কৃষক বেকার হয়ে পড়েছে। নদী ভাঙনের শিকার হয়ে হাতিয়ার বহু পরিবার বেড়ি বাঁধের উপর, খাস জমি, বয়ারচর, নিঝুমদ্বীপ, চরবাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। বহু লোক বাস্তুভিটে হারিয়ে একখণ্ড খাস জমি পাওয়ার আশায় তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে। হাতিয়ার ভূমিহীনের সংখ্যা হাতিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। ভূমিহীনরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে হাতিয়ার আশেপাশে জেগে ওঠা বিভিন্ন চরে আশ্রয় নিচ্ছে।

নদী ভাঙনের কারণে হাতিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এএম হাইস্কুল, হাতিয়া হাইস্কুল, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কয়েকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়, সুখচর মফিজিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও সুখচর আজহার উলুম সিনিয়র মাদ্রাসাসহ আরো কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অন্য ইউনিয়নে স্থানান্তর করা হয়েছে। হাতিয়ার আহমদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাহেবানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরবাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বহু সরকারি প্রাইমারি স্কুল বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর করতে হয়েছে নদী ভাঙনের কারণে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন হলে ছাত্র-ছাত্রীদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। নদী ভাঙনের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের স্থানান্তরিত হতে হয় বিভিন্ন জায়গায়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থান পরিবর্তনে দূরত্ব বেড়ে যায়। ফলে অনেক ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

হাতিয়ার নদী ভাঙনের জন্য প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট দুটো কারণই দায়ী।

১৯৮৪ সালের এপ্রিলে হাতিয়ার ভাঙনরোধ বিষয়ে ‘ভাঙনরোধের সুপারিশমালা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী হাতিয়ার ভাঙনরোধে দীর্ঘ মেয়াদি সুপারিশসহ বাঁধ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। বর্তমানে চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট (সিডিএসপি) নেদারল্যান্ডের সহযোগিতায় হাতিয়ার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। তবে কাজের গতি খুবই ধীর। জরুরি ভিত্তিতে তীর রক্ষা বাঁধ (ব্লক বাঁধ) করা হলে হাতিয়াকে দীর্ঘমেয়াদি ভাঙন থেকে রক্ষা করা সম্ভব। হাতিয়ায় নদী ভাঙন অব্যাহত থাকলে অচিরেই এই সমৃদ্ধশালী দ্বীপটি বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আয়েশা ফেরদাউস বলেন, হাতিয়া উপজেলার ১২ কিলোমিটার এলাকা নদী ভাঙনরোধকল্পে একটি প্রকল্প পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে হাতিয়ার নদী ভাঙনরোধ হবে বলে আশা রাখি।

ইত্তেফাক/নূহু