ঝুঁকি নিয়েই টেম্পোর হেলপার হয় শিশুরা

গুলিস্তান থেকে আজিমপুর হয়ে নিউমার্কেট যাবে রুবেলের (৮) টেম্পো। হাতল ধরে নিউমার্কেট নিউমার্কেট বলে চিত্কার করে যাত্রী ডাকছে সে। কিছুক্ষণের মধ্যে যাত্রীতে ভরে যায় তার টেম্পো। সে পাদানিতে দাঁড়িয়ে রড ধরে ঝুলতে ঝুলতে যেতে থাকে। পথে এই পাদানিতে আরো তিনজন যাত্রী ওঠে। অবস্থা এমন যে রুবেলের আর পা রাখার জায়গা থাকে না। কোনো রকমে ঝুলে থাকে সে।

নিউমার্কেট থেকে ফার্মগেট যাবে মিলনের (১২) টেম্পো। সেও একইভাবে চিত্কার করে যাত্রী ডাকে। এখন রোজা। সামনে ঈদ। তাই যাত্রীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তারা দুজনই জানায়, তাদের পড়তে ভালো লাগে না বলে কাজ করতে এসেছে। কাজে কষ্ট আছে কিন্তু দিন শেষে হাতে টাকা পেলে কষ্ট থাকে না। প্রতিদিন তাদের দু’শ থেকে তিন’শ টাকা আয় হয়। আর ১৩ বছরের মিলন মিয়া পাঁচ বছর হেলপারি করে এখন ড্রাইভার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কেন এই কাজে এলো এমন প্রশ্ন করলে মিলন জানায়, যখন-তখন কাজ করার স্বাধীনতা, আর অল্প কষ্টে হাতে কিছু টাকাও পাওয়া যায়। কষ্ট কি অল্প, যে কোনো সময় তো একটা দুর্ঘটনা জীবন এলোমেলো করে দিতে পারে। মিলন উত্তর দেয়, এত কিছু চিন্তা করলে কি হবে? গাড়িতে উঠলেও তো অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে।

এমনই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আজ সোমবার ১২ জুন দেশে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। শিশু অধিকার সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবছর দিবসটি পালন করে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘সংকট দুর্যোগ যাই হোক, শিশুশ্রম বন্ধ হোক’। দিবসটি উপলক্ষে ১৩টি শিশু অধিকার সংগঠনের নেটওয়ার্ক ‘অ্যালায়েন্স এগেইনস্ট চাইল্ড লেবার-এসিএল আজ ছায়ানট মিলনায়তনে আলোচনা সভা এবং শ্রমজীবী শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

গতকাল সরেজমিনে গুলিস্তান, নিউমার্কেট, ঝিগাতলা, মোহাম্মদপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেল, অসংখ্য শিশু প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা/১০টা অবধি টেম্পোর হেলপারি করছে। অথচ ২০১৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করার কথা।

জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০১৩ এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এ জরিপে দেখা যায়, এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। প্রতিবেদন অনুসারে দেশে পরিবহন ও সংরক্ষণাগার খাতে মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৭২৮ জন, যা মোট শিশু শ্রমিকের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে সুনির্দিষ্টভাবে লেগুনা বা টেম্পোতে কত শিশু শ্রমিক কাজ করে তার হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে ৬০ হাজার শিশুকে ৪ বছর মেয়াদি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আরো ৫০ হাজার শিশুকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুনর্বাসনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ’র (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, গ্রামভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। স্কুলকে যুক্ত করে শিশুদের নিজের এলাকাতে রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি। অভিভাবকদের ও যারা শিশুদের নিয়োগ দেবে তাদের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমতি নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যেন বিষয়টি নিবন্ধন থাকে। ২০১৬ সালে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল তা ছিল শহরভিত্তিক তাই তা কার্যকর হয়নি। সমাজ কল্যাণ, ধর্ম ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করে কার্যক্রম হাতে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শ্রমজীবী শিশুদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা থেকে সাধারণ শ্রমে নিযুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। শিশু আইন ২০১৩ ও জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কোনো কাজে নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ১৮ বছরের নিচের কোনো শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ দেশে নেই বলছেন সৈয়দ সুলতান আহমেদ।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি ইত্তেফাককে বলেন, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে তুলে নিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই ন্যায়পাল গঠন ও আলাদা শিশু অধিদপ্তর করার পরিকল্পনা করছে সরকার।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ শিশুশ্রম প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠন ও সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিষয়ক এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিশুশ্রম নিরসনকে অন্যতম সূচক হিসেবে নির্ধারণ করেছে। যে কোনো সংঘাত, সংকট, দুর্যোগে শিশুদের নিরাপদ রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর।

ইত্তেফাক/নূহু