নাট্যসাহিত্যে নারীর উপস্থাপনা জেন্ডার প্রেক্ষিত

 ‘এ ডলস হাউস’-এ হঠাত্ করেই নোরা উপলব্ধি করে স্বামী আর সংসারের জন্য সে এতকাল যা করেছে তা একেবারেই মূল্যহীন। জীবনের প্রতিভাঁজে প্রতিটা পুরুষ এক-একটা মূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে—সে তাদের সবার হাতে—দমের পুতুল চলেছে-ফিরেছে। আলাদা কোনো মানুষের পরিচয় বা সম্মান সে পায়নি। এক নিরন্তর নিজস্ব মনোপীড়নের মধ্যে দিয়ে সহসা নিজেকে সে আবিষ্কার করে—বড় একা সে, কিন্তু তবু অসহায় নয়। তার বিদ্রোহী মন মুহূর্তেই এক ক্ষিপ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্বামী-সন্তান এবং নরওয়েজীয় বালক-বালিকাদের প্রিয় খেলনার প্রতীক—পুতুলের ঘর পেছনে রেখে এক অনিশ্চিত এবং স্বেচ্ছাকৃত অথচ অনির্ণীত গন্তব্যের দিকে চলে যায় নোরা। সমাজকে এ কথা জানাতেই যেনবা—নারীর চিরকালের চেনা ঠিকানাটা পুরুষের হাতেই বাঁধা নয়।

বিষয়টা ‘আন্না কারেনিনা’য় আরো ভালোভাবে আছে। ইউরোপ টলস্টয়ের বিশেষ খ্রিস্টীয় আদর্শের জন্য সেভাবে হয়তো তাঁকে গ্রহণ করেনি। আন্না কারেনিনা আত্মউপলব্ধির এক জায়গায় এসে দেখতে পেয়েছিল—তার স্বামীর নিদারুণ শীতল অবহেলা। সে হূদয়াবেগে ধাবিত হলো এক নতুন প্রেমের আহ্বানে। কিন্তু রুশীয় অর্থডক্স ক্যাথলিক ধর্মমতের অনড় প্রতিষ্ঠানের নিচে বিবাহবিচ্ছেদ চলে না। শেষাবধি আন্নার প্রেম পরিণতি লাভ করেছিল আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। আন্নার প্রেম-আত্মহত্যা সমগ্র রুশ সমাজকে হতচকিত করে দিয়েছিল সেকালে। ধর্মের প্রচলের কাছে নির্বিরোধ আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে তাদের সমাজ মানসে ধিক্কার উঠেছিল সেই সময়ে।

কিন্তু কুড়ি শতকে এসে রবীন্দ্রনাথ চিত্রাঙ্গদায় নারীর প্রাচ্য রূপটি প্রকৃত অর্থেই খুঁড়ে তুলে আনলেন প্রত্মকালের গল্পচ্ছলে। মহাভারতের ছোট্ট আয়তনের একটা মিথকে বিস্তৃততর পরিসরে নিয়ে এলেন তিনি। দেখালেন—প্রাচ্যে নারীর আদর্শগত স্থানটি কোথায়। হরিণ শিকারের ক্রীড়ায় মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা বনপথে অর্জুনের দেখা পেল। কিন্তু ব্রহ্মচারী অর্জুন তাকে ভ্রূক্ষেপমাত্র করল না। চিরকালের বঞ্চিত নারীর পুরুষকর্তৃক এই অসম্মান চিত্রাঙ্গদাকে টেনে নিয়ে গেল এক ভিন্নতর ছলনার দিকে। মদনের কাছ থেকে এক বছরের জন্য স্বর্গীয় লাবণ্যের বর পেল সে। ফুটে উঠল সে স্থল সম্বন্ধহীন—শুধু আকাশ কুসুম—কিন্তু মাত্র এক বছরের জন্যে। মনঃস্তাত্ত্বিকভাবে চিত্রাঙ্গদা টের পেল—এ তার ভুল পথযাত্রা। আত্মপরিচয় লুপ্ত করে দিয়ে সে সেখানে এসে অর্জুনকে আকর্ষণ করল—সে বড় ক্ষণস্থায়ী। আত্মগ্লানিতে পরিপূরিত চিত্রাঙ্গদার দাম্পত্যজীবনে একটা বিষণ্ন এবং আসন্ন শীতে পাতা ঝরার সময় উপস্থিত হলে মদনের বরদানের সময়কালের ব্যাপ্তি ফুরিয়ে আসার আগে সে নির্মোহ আত্মঅভিজ্ঞা প্রকাশের সঙ্কল্প করে সে।

মণিপুর দস্যু আক্রান্ত হলে সে সুকুমারী লাবণ্য ঝেড়ে যোদ্ধাবেশ পরে দাঁড়ায়। সে শুধু চিত্রাঙ্গদা—দেবী নয়—নারী কিন্তু শুধু নারী নয়। সংকটে-বিপদে সেও অর্জুনের সমান অংশীদার। পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এমনকি নারীবাদী কবিপ্রিয় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনায় পার্থক্য এখানেই।

 

দুই.

বাংলা নাটক বলতে আমি সহস্র বছরের বাংলা নাটককেই নির্দেশ করতে চাই। কারণ অষ্টাদশ শতকে বাংলা মঞ্চনাটক ইউরোপীয় রূপশয্যায় অবির্ভূত হলেও তার প্রাণপ্রবাহে বাঙালির চিরকালের মানবদর্শন অক্ষুণ্ন ছিল।

যখন ‘মহুয়া’-‘দেওয়ানা মদিনা’-‘চন্দ্রাবতী’র মতো অসামান্য পালানাট্য রচিত হয়েছিল প্রাচীন বঙ্গে—তখন ইউরোপে নারীর বিদ্রোহ শিল্পভাষ্য লাভ করেনি। প্রাচীন গ্রিসে ইউরিপিদিস এজন্য ধিকৃত হয়েছিলেন যে, তিনি নারীর চরিত্রকে কেন্দ্রে রেখে নতুন ধরনের ট্রাজেডি রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। আরিস্তোফেনিসের ‘দ্যা ফ্রগস’ পড়লেই টের পাওয়া যায়—ট্রাজেডি রচয়িতাদের মধ্যে ইউরিপিদিসকে কতটা নিম্নবর্গীয় নাট্যকাররূপে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের পালাকারগণ ‘মহুয়া’-‘মলুয়া’-‘কাঞ্চনকন্যা’র মতো অজস্র ট্রাজেডির জন্ম দিয়েছেন এবং সেগুলো আজও শ্রদ্ধাভরে গীত ও মঞ্চস্থ হয়।

তবে সে পালাগুলোর উদ্ভব ও প্রয়োগের একটা কৌতুহলোদ্দীপক প্রসঙ্গ আছে। উল্লিখিত পালার প্রায় সবই খরাকালে বৃষ্টি নামানোর জন্য পরিবেশিত হতো। সর্বপ্রাণবাদী দর্শনজাত ঐ সব পালার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য পালার পরিণামেই আছে।

‘মহুয়া’ বা ‘দেওয়ানা মদিনা’র আত্মহনন কিংবা প্রায় আত্মহননের গানে—রৌদ্রপোড়া আকাশে ঘনকৃষ্ণ মেঘ ঘনাবে উষর ও ফসল প্রত্যাশী মাঠে বৃষ্টি ঝরবে অঝোর প্রবাহে। ফসল ফলবে মাঠে।

কিন্তু তা থেকেও ওই সমাজে একইসঙ্গে নারী নিপীড়ন এবং নারীর প্রতি কবির সংবেদনশীলতার একটা পরিচয়ও লভ্য। প্রায় প্রতিটি গীতিকানাট্যেই দেখতে পাই—নারীর আকাঙ্ক্ষা পুরুষের স্বেচ্ছা—যথেচ্ছাচারের শিকার—কখনো লালসা—কখনো বিধিবদ্ধ সামাজিক নিয়ম নারীকে ঠেলে দিয়েছে অনিবার্য মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যার পথে। তবে এই আত্মহত্যা পরাজিতের নয়—নিশ্চিতই বিদ্রোহী নারীর। আত্মহত্যা সব সময় যে পরাজয়ের স্মারক নয়—আশা করি সেকালের দর্শকদের মতো এ কালের পাঠকও তা বুঝতে পারবেন।

অন্যদিকে মঙ্গল বা প্রণয়পাঁচালিতেও দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া নারীর ব্যক্তিত্ব—তার আশা আকাঙ্ক্ষা-প্রণয়-হূদয়ক্ষত-প্রতিবাদ-প্রতিরোধ স্পষ্টভাবেই চিত্রিত হতে দেখি।

সবচেয়ে বেশি দেখি বোধহয় মনসামঙ্গলে। মনসার ভুল জন্ম—বেহুলার প্রেম এবং স্বর্গসভায় দেবতার মনোরঞ্জনের জন্য নৃত্যকী বেহুলাকে সমাজ কর্তৃক পরিত্যাগ—অভিমানী বেহুলার মৃত্যুপুরীতে চলে যাওয়া সবই ঐ নারী চরিত্রের আত্মত্যাগ ও আত্মোপলব্ধির এক সুবিস্তারিত মহাকাব্য।

তবে বৈষ্ণব ধর্মমতের উদ্ভব ও বিস্তারের কালে রচিত নাট্য বা সংগীতে—শিল্প সাহিত্যে নারীর সকল মহিমা এক রাধা চরিত্রে এসে যে লুপ্ত হলো তার সামাজিক কারণ অন্বেষণ জরুরি। যদিও দ্বৈতাদ্বৈতবাদী দর্শনে রাধা কৃষ্ণের জন্য সমাজ অপরিহার্য এবং ঐ দর্শনে বলা আছে যে—পুরুষ ও প্রকৃতির মিশ্রণেই সৃষ্টি। কিন্তু স্বয়ং চৈতন্যদেব নারী বিবাগী। তাছাড়া তাঁর প্রবর্তিত নাম-সংকীর্তনে নারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। তবে বৈষ্ণবদর্শনে নারীর দ্বিবিধ মূর্তি একটি মাতৃ আবেশের অন্যটি সাধন-সঙ্গিনীর। অবশ্য পরে এই ধর্ম বিকৃতির পথেই ধাবিত হয়েছিল—যতদূর জানা যায়।

 

তিন.

বাংলাদেশের নাটক আর বাংলা নাটক—দুটো মিলিয়ে বাংলা নাটকে নারীর অবস্থান কালোপযোগী কিন্তু ইউরোপের তুলনায়— শুরুর দিকটা অন্তত খুবই সংকীর্ণ। অর্থাত্ নারীর সামাজিক প্রেক্ষাপট তাকে ক্ষমতায়ন থেকে বহুদূরেই রেখেছে। এর কারণও সামাজিক। কলকাতাকেন্দ্রিক যে বিলাসী সামন্ত সংস্কৃতির উদ্ভব সেকালে ঘটেছিল—তাতে নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য একেবারেই অবলুপ্ত। এর আরো একটি কারণ সামন্ত শ্রেণির ভোগ লালসার সঙ্গে নারীর প্রতি ধর্মীয় নিয়মবিধির কড়াকড়ি।

নারীর আত্মপরিচয়ের যে অনিবার্য রূপ—তা প্রকাশিত হয়েছিল নাটকে নয়—আমাদের শিল্প পিতৃপুরুষ মধুসূদনের হাতে। প্রমীলা চরিত্রের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। তাঁর ‘কৃষ্ণকুমারী’ মঞ্চের মুখে তাকিয়ে লেখা সেজন্য সেকালের সামাজিক বিধি অনুযায়ী কৃষ্ণা—যাকে বলে অন্তঃপুরবাসিনী। অন্য নাট্যকারের নাটকে স্বদেশি এবং অন্যান্য আন্দোলনে আত্মত্যাগের ঘটনায় পুরুষের ভূমিকা যতটা—নারীর ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটক ‘নূরজাহান’। এই নাম চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি মুঘল পরিবারের অন্তর্ঘাতমূলক ষড়যন্ত্র এবং নূরজাহানের রূপ লাবণ্য দ্বারা কৌশলগত মোহ বিস্তার এবং সম্রাটের সকল ক্ষমতা দখলের চিত্র এঁকেছেন। কিন্তু সে পরিণামও যেন লেডি ম্যাকব্যাথের ছকে বাঁধা। আবার তাঁরই অন্যতম সেরা নাটক শাহজাহান-জাহানারা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে ছলনা কপটতার অভিযোগ—সরাসরি ব্যাঙ্গ এবং ক্ষমাহীনতা জাহানারা চরিত্রকে সমকালের বিদ্রোহী নারীরূপে চিহ্নিত করেছে।

বাঙালি নারীর বিপুল আদল উন্মোচিত হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্র ও শরত্চন্দ্রে। তবে তাঁরা কেউ সরাসরি মঞ্চস্থ হবার জন্য নাটক লেখেননি। বঙ্কিম নারীচরিত্র অঙ্কনে নিঃসন্দেহে অগ্রবর্তী। সেখানে নারী অধিকারবঞ্চিত হলেও রোহিনীর মতো বিদ্রোহীর সাক্ষাত্ পাই। তবে নারীর প্রতি শরত্চন্দ্রের সমবেদনা এক অসাধারণ শিল্প মহিমায় উদ্ভাসিত। তা মানব মহিমায়ও চিহ্নিত হবার যোগ্য।

রবীন্দ্রনাথেই বাঙালি নারীর প্রকৃত উন্মোচন ঘটে। স্মরণ করতে চাই প্রথম দিকের ‘চণ্ডালিকা’ কিংবা পরিণতকালের ‘শ্যামা’ এবং ‘রক্তকরবী’র বিদ্রোহী নন্দিনী। বিশ্বনাট্যে অমন দ্বিতীয় চরিত্র কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে ‘ঘরে বাইরে’র বিমলা রক্তমাংসের নারী। আত্মোপলব্ধি-বেদনা-পাপ স্বীকারের মধ্য দিয়ে বিমলা রবীন্দ্র মহাভুবনের উজ্জ্বলতম নারী। সে ‘নষ্ট নীড়’-এর চারুবালার মতোই পারিবারিক জীবনের চৌহদ্দিতে হাঁপিয়ে ওঠা নারী। বিমলাকে কেন্দ্র করেই সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির দ্বিমুখীনতা স্পষ্টই হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রপরবর্তীকালের বাংলা নটক বহুক্ষেত্রে স্থূলবাস্তবতাবাদ দ্বারা ক্লিষ্ট। সুতরাং পাণ্ডুর। পঞ্চাশ ষাট দশকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাস্তবতাবাদকে ভেঙে এক অপূর্ব পরাবাস্তব রচনা করেছেন ‘তরঙ্গভঙ্গ’ নাটকে। মূল চরিত্র একজন ভিখিরিনী—যে অভাবের তাড়নায় পুত্রহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। বাস্তবতার উল্টো ছায়াটা নাটকে ঘুরে আসে—শেষমেষ আদালতে জজের টেবিলে। জর্জ সাহেব চশমা খোঁজেন। এ এক অসমাধিত সমাজপর্ব—যা উন্মোচিত হলো এক নারী চরিত্রের ভেতর দিয়ে।

চার.

জেন্ডার প্রেক্ষিত কথাটা এইস্থানে এসে একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। ওটা ইউরোপীয় দৃষ্টিসঞ্জাত শব্দ। যে সমাজ পূর্ণাঙ্গরূপে গণতান্ত্রিক নয়—রাষ্ট্র যেখানে বিকশিত হয়নি—সে সমাজে নারীর যোগ্য মর্যাদা প্রদান লেখকের পক্ষেই সম্ভব। এই ইস্যুতে—ক. নারীর প্রতি বৈষম্য। খ. নারীকে প্রকৃতিগতভাবে দুর্বল মনে করা। গ. নারীর ক্ষমতায়নে সুবিধাবাদী মহলের ধর্মীয় অনুশাসনের অপব্যাখ্যা। ঘ. নারীকে অকাতরে ভোগ্য সামগ্রীর সমান মনে করা। ঙ. নারীর জন্য দ্বিমুখী সামাজিক নিয়ম ও রাষ্ট্রীয় আইন—এসব অযৌক্তিকতাকে অস্বীকার ও প্রতিরোধ করার সঙ্কল্প ও প্রয়াস আছে।

সৃষ্টিশীল লেখার ভেতরে সরাসরি এই ইস্যুগুলো ঢুকে যেতে পারে যদি লেখক তাঁর শিল্পকৌশলে অভ্রান্ত হন। নতুবা জেন্ডার প্রেক্ষিতের বিষয়টি নাটককে আড়ষ্ট ও নিরেট প্রচারমুখী করে তুলবে।

তবে একথা ঠিক যে—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—শুরুতে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি খুব সহজে সকলের ভাবনার দুয়ারে নিয়ে এসেছিল। অচিরাত্ তা রাজনৈতিক কারণে জটিল হয়ে উঠল। আমরা শুনতে পেলাম নারীর পক্ষে রাষ্ট্রের প্রধান হওয়া পাপ। আমরা শুনতে পেলাম নারীর এই করলে ওই হয়। তার পোশাক-চলন-বিচারপদ্ধতি-বিবাহ-তালাক—সবই একেবারে সামাজিক নিয়মে বাঁধা। এ যেন রোমানদের নারীর অবস্থা। যুদ্ধে যাবার আগে নিম্নাংশ সুরক্ষিত করে চাবিটা যাজকের হাতে দিয়ে যাওয়া।

না—বাংলাদেশের মঞ্চনাটকে নিখুঁত নান্দনিক ভাবনায়—নারী বৈষম্যের কোনো কালজয়ী নাটক আজও রচিত হয়েছে বলে মনে হয় না। আমাদের নাটকে তারা বিশ-দশজনের মধ্যে যেন একজন হয়ে এসেছে। তবু তারই মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক-মমতাজ উদ্দীন আহমেদ-আবদুল্লাহ আল মামুন-মামুনুর রশীদ—তাঁদের নাটকে নারীচরিত্রের নানা দিক আভাসিত করেছেন। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-তে বঞ্চিত লুণ্ঠিত নারীর তীব্র শ্লেষ আমাদের মনকে নাড়া দেয়। ‘কোকিলারা’ নাটকে নারীর অসম্ভ্রমের ব্যাপারটি চোখে পড়ে। মামুনুর রশীদের নাটকে নারীর বিদ্রোহী রূপটিও পরিকল্পিত।

উল্লেখ্য যে—আমাদের বাংলা ভাষায় বিশেষত বাংলাদেশে কোনো মহিলা নাট্যকার সেভাবে এগিয়ে আসেননি। অথচ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নাটক সমুজ্জ্বল ভূমিকায় গৌরবান্বিত।

নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আমাদের উপন্যাস-কবিতা-নাটক এমনকি চিত্রকলায়ও প্রায় অলক্ষিত। এখানে নারীর যৌন নিপীড়নের মর্মান্তিক চিত্র ছাড়া আর কিছুই যেন লিখবার নেই। কিন্তু অবাক কাণ্ড এই যে—মধুসূদন সুলতানা রাজিয়াকে নিয়ে মহাকাব্য লিখতে চেয়েছিলেন এবং তারও বহুপরে প্রাচ্যের পূর্ণচাঁদিমা বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন ‘সুলতানার স্বপ্ন’।

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের নাটক শিল্পের নিজস্ব নিয়মেই এক প্রবল ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আমরা যারা লিখি বা লিখবার চেষ্টা করি তাদের উপলব্ধির জগত্টা একেবারেই প্রচল আর অনুবর্তনে ঠাসা।

আমার নিজের সম্পর্কে বলবার বিষয় এই যে—প্রোপাগাণ্ডা সাহিত্যে আমি একেবারেই অপটু। নারী ও পুরুষের লিঙ্গগত বিভাজনের দৃষ্টি অর্জন আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যে দ্বৈতাদ্বৈত ভুবনের স্বপ্ন আমি দেখি—তাতে নারীকে দেখি—প্রাচ্যের আদলে বিদ্রোহী কিন্তু প্রকৃতিস্বরূপা। তার বঞ্চনা অসম্মানের সকল দায় নিয়েই আমি লিখতে চেষ্টা করি।

সবশেষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই এই জন্য যে—তাঁরা উপর্যুক্ত বিষয়ে লিখার জন্য আমাকে মনোনীত করেছেন। তাঁদের উদ্দেশে বলি—পৃথিবীর ইতিহাসের অগ্রযাত্রায়—যুগে যুগে নারীর অবদান পুরুষের সমান। সভ্যতার যে কালকে আমরা ধ্রুপদিকাল বলে চিহ্নিত করি সে কাল পুরুষবৃত্তির কাল। নারীকে উপলক্ষ করে মাত্র সে সকল সাহিত্য রচিত হয়েছে। হেলেন সেখানে উপলক্ষ—ইলিয়াড জয়গান করেছে পুরুষের বীরত্বের। কিন্তু স্বামীহারা নেফারতিতির ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা মিশরীয় ইতিহাসে আছে। সে শিক্ষা কোনো কবি বা নাট্যকারের তোয়াক্কা করে না। নেফারতিতি নিহত হয়েছিলেন প্রাচীন রাজতন্ত্রের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে। 

এও জানি রক্তপিপাসু সন্দেহবাতিকগ্রস্ত আরব্যরজনীর রাজা শাহরিয়ার—শাহেরজাদীর গল্পের অমৃতে গোসল করে নারী হত্যার সংকল্প থেকে সরে এসেছিলেন মনঃস্তাত্ত্বিকভাবে। প্রার্থনা নয়—দয়া ভিক্ষা নয়—পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে সৃষ্টি নারী নয়—আমাদের দেশকালের প্রেক্ষাপটে আমাদের নারীসমাজ নিজ অধিকার আদায়ের অভ্রান্ত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে।

আর আমরা যারা তাঁদের প্রকৃত অধিকার অর্জনের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করব—লেখক হিসেবে তা হবে নিজেকে যথার্থরূপে আত্মমর্যাদার স্থলে দাঁড় করানো। সে লক্ষ্যে আসতে হবে সকল সক্রিয় লেখককে। ধন্যবাদ।

 

লেখাটি ২৮ জানুয়ারি, ২০০৫-এ সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের একটি সেমিনারে পাঠ করেছিলেন।

 

কৃতজ্ঞতা :সাইমন জাকারিয়া