রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে নূরুল ইসলাম হত্যা মামলায় স্ত্রী নূরানী আক্তার সুমী ও কাস্টমসের সাবেক কমিশনার শাহাবুদ্দীন নাগরীকে আসামি করে চার্জশিট দিচ্ছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সুমীর সঙ্গে শাহাবুদ্দীন নাগরীর পরকীয়া সম্পর্কের জের ধরেই নূরুল হত্যার শিকার হয়েছেন। দাম্পত্য কলহের জের ধরে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সুমী তার স্বামীকে ধাক্কা দিলে তিনি ড্রেসিং টেবিলের ওপর পড়ে যান। মাথায় আঘাত লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। শাহাবুদ্দীন নাগরীর সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে নূরুল-সুমী দাম্পত্য কলহ ছিল তখন তুঙ্গে। এ কারণে এই মামলায় সুমীকে প্রধান আসামি এবং শাহাবুদ্দীন নাগরীকে সহযোগী আসামি হিসেবে অভিযোগ আনা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (পশ্চিম) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার রাজীব আল মাসুদ বলেন, এই হত্যার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পুলিশের কাছে এসেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আঘাতজনিত কারণে নূরুলের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে যে, ঘটনার দিন সুমী তার স্বামীকে ধাক্কা দিলে তিনি ড্রেসিং টেবিলের ওপর পড়ে যান। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। এ থেকেই তার মৃত্যু হয়।
তিনি আরো বলেন, সুমী হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার জবানবন্দিতে শাহাবুদ্দিন নাগরীর এ হত্যার সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু নূরুল-সুমী দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হয়েছে শাহাবুদ্দিন নাগরীকে কেন্দ্র করেই। ভারতে ঘুরতে যাওয়ার জন্য সুমী তার পাসপোর্ট করতে শাহাবুদ্দিন নাগরীর সহায়তা নেন। এ বিষয়টি নূরুল সহজভাবে মেনে নেননি। এর জের ধরেই তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ হয়। এ কারণে এই মামলায় হত্যার ঘটনার সঙ্গে শাহাবুদ্দিন নাগরীর সংশ্লিষ্টতা আনা হয়। শিগগির এই মামলার চার্জশিট প্রদান করা হবে।
গত ১৩ এপ্রিল এলিফ্যান্ট রোডের ১৭০/১৭১ নম্বর ডমো-ইনো অ্যাপার্টমেন্টের ৫ম তলায় ব্যবসায়ী নূরুল ইসলামকে (৪৭) তার নিজ বেডরুমের ফ্লোরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ১৪ এপ্রিল নিহত ব্যবসায়ীর বোন শাহানা রহমান কাজল বাদী হয়ে ভিকটিমের স্ত্রী নূরানী আক্তার সুমী (৩৫), স্ত্রীর বন্ধু সাবেক কাস্টমস কমিশনার শাহাবুদ্দিন নাগরী (৬০), গাড়িচালক সেলিমসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় শাহাবুদ্দিন নাগরী এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি ছিলেন। এই মামলার পরিপ্রেক্ষেতে শাহাবুদ্দিন, সুমী, গাড়িচালক সেলিমকে গ্রেফতার করে পুলিশ ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়। পরে নিউমার্কেট থানা পুলিশ শাহাবুদ্দিন ও সুমীকে পৃথক ৪ দিনের রিমান্ডে নেয়। মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে স্থানান্তর হলে তাদেরকে আবারো ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শাহাবুদ্দিন নাগরী তার প্রেমিকা সুমীকে এলিফ্যান্ট রোডের ১৭০/১৭১ নম্বর ডমো-ইনো অ্যাপার্টমেন্টের ৫ম তলায় একটি ফ্ল্যাট মাসিক ৩৪ হাজার টাকায় ভাড়া করে দেন। ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া তিনি পরিশোধ করতেন। এমনকি সুমীকে ১৪ লাখ টাকা দিয়ে একটি গাড়িও কিনে দিয়েছেন। ২০১৩ সালে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডের একটি ফ্ল্যাটে সুমীর সঙ্গে নাগরীর প্রথম পরিচয়। কিন্তু সেখানে একাধিক খদ্দেরের যাতায়াত ছিল বলে তার সেখানে যাওয়া সম্ভব হতো না। এ কারণে এক বছর আগে তিনি (নাগরী) এ্যালিফ্যান্ট রোডের ঐ ফ্ল্যাট ভাড়া করে সুমী-নূরুল দম্পতিকে থাকতে দেন। সুমীর সঙ্গে চুক্তি ছিল যে সে পেশাদার কলগার্ল না হয়ে শুধু তার মনোরঞ্জনে ব্যস্ত থাকবে। এ জন্য তাদের সংসারের খরচ বাবদ ৫০ হাজার টাকা দিতেন। এই খরচের একটি অংশ সুমী তার স্বামীকে হাত খরচ হিসেবে দিতেন। সেই টাকা নিয়ে নূরুল জুয়া খেলতেন। ঐ ফ্ল্যাটে একটি নির্দিষ্ট কক্ষ ছিল যেখানে সুমীর সঙ্গে তিনি (নাগরী) রাত কাটাতেন। ভারতে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা নেন তারা। এ জন্য সুমীর পাসপোর্ট করার উদ্যোগ নেন শাহাবুদ্দীন নাগরী। বিষয়টি টের পেয়ে নূরুল ইসলাম বাধা দেন। কারণ নূরুলের ভয় ছিল স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে গেলে তিনি বিপদে পড়ে যাবেন। কারণ নুরুল ছিলেন বেকার। স্ত্রীর রোজগারের টাকা দিয়ে তিনি মদ্যপান আর জুয়া খেলতেন। এসব নিয়ে তাদের দাম্পত্য কলহ তুঙ্গে ওঠে।
ইত্তেফাক/নূহু