ভূমিসংক্রান্ত হয়রানির অবসানে ই-নামজারির উদ্যোগ

দেশে ভূমিসংক্রান্ত দুর্নীতি লইয়া প্রচুর অভিযোগ পাওয়া যায়। ভূমি কার্যালয় হইতে নথিপত্র উঠাইতে গিয়া, নামজারি করিতে বা কর প্রদান করিতে হয়রানির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। মানবাধিকার কমিশনের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, তাহাদের নিকট এককভাবে সংখ্যায় সর্বাধিক অভিযোগ দাখিল হইয়াছে ভূমিসংক্রান্ত অনিয়ম আর ভোগান্তি লইয়া। দুর্নীতি দমন কমিশনের নিকটও রহিয়াছে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও তাহার সেবাসংক্রান্ত বহু অভিযোগ। দুর্নীতির নানান প্রকরণের মধ্যে ভূমির অবস্থান প্রথম দিকেই। ইহা ছাড়া ভূমিই হইল সংঘাত-সংঘর্ষের অন্যতম উত্স। বহু মামলা-মোকদ্দমা চলিতেছে ভূমিবিরোধ নিয়া। ভূমি-সংক্রান্ত নানান দুর্নীতি, হয়রানি, বিবাদ দূর করিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। জমির নামজারির বিদ্যমান প্রক্রিয়াটি উদাহরণ হিসাবে লইলে বোঝা যাইবে দুর্নীতি ও হয়রানির পরিস্থিতিটি। জমির নামজারির জন্য ভূমি অফিসে ফি জমা দিবার পর দীর্ঘ সময় পার হইয়া গেলেও অগ্রগতি হয় না। নামজারির জন্য ভূমির মালিককে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করিতে হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, নির্ধারিত ফি’র সহিত জমির মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্র এসি ল্যান্ড কার্যালয়ে জমা দিতে হয়। সেইখান হইতে তাহা পাঠানো হয় তহশিলদারের কার্যালয়ে। তহশিলদার ‘সন্তুষ্ট হইলে’ তাহা পাঠান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। ইহার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়। তখন এই প্রক্রিয়ায় জড়িত হন ভূমি অফিসের নাজির। ইহা ছাড়া জমির ক্রেতা-বিক্রেতাকে ল্যান্ড ট্রান্সফার (এলটি) নোটিস দেওয়া হয়। সকল কিছু ঠিক থাকিবার পরও ভূমির মালিককে নামজারি করিবার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিতে হয়। একইসঙ্গে ভূমি অফিসের প্রায় প্রতিটি ধাপে ঘুষ প্রদান করিতে হয়।

তবে সাধারণ মানুষের হয়রানি দূর করিতে ২০০৯ সাল হইতে সরকার গ্রহণ করিয়াছে অনলাইন মালিকানা নিবন্ধন ও নামজারি করিবার উদ্যোগ, যাহা সংক্ষেপে ‘ই-নামজারি’ নামে পরিচিত হইয়াছে।  সাধারণত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা অনেক দুর্নীতি দূর করিয়া দেয়, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনয়ন করে এবং সেবাপ্রদানের ক্ষেত্রে গতিশীলতা তৈরি হয়। ই-নামজারির উদ্যোগ এইসকল সুবিধা আনিয়া দিতেছে। ভূমিমন্ত্রী সোমবার ঘোষণা দিয়াছেন, জুনের মধ্যেই সারা দেশে ই-নামজারি ব্যবস্থা চালু হইতেছে। ফলে নামজারির জন্য আর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিতে হইবে না, মাত্র ২৮ দিনের মধ্যেই নামজারি সম্পন্ন হইবে। ইতোমধ্যেই রাজধানীসহ ঢাকা জেলায় প্রায় চার লাখ ই-নামজারি সম্পন্ন হইয়াছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করিতে ১০ এপ্রিল হইতে ভূমি সেবা সপ্তাহ ও ভূমিকর মেলা অনুষ্ঠিত হইবে। অনলাইনে লেখা ও ভিডিওর মাধ্যমে ই-নামজারি বিষয়ক সচেতনতামূলক বার্তা ও এই সংক্রান্ত নিয়মাবলীর প্রচার হইতেছে। এইসকল উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষকে প্রযুক্তিনির্ভর নামজারিতে আগ্রহী করিয়া তুলিবে। মানুষ ঘরে বসিয়া তাহার নামজারির কাজটি সম্পন্ন করিতে পারিবেন। ভূমি অফিসের সর্বজনবিদিত দুর্নীতি ও হয়রানিও অনেকখানি দূর হইবে। সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। যদিও এই পুরা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিতে বা সারাদেশে ই-নামজারি প্রচলনে ধীরগতি দেখা গিয়াছে, কিন্তু সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিশ্চয়ই সর্বব্যাপী হইবে এবং এই উদ্যোগ হইতে মানুষ উপকৃত হইবে।