কারো সঙ্গে যুদ্ধ নয়, তবে আক্রমণ করলে জবাব দেওয়া হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের সঙ্গে সংঘাতে না জড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, যেহেতু তারা আমাদের একবারে প্রতিবেশী, সেহেতু আমরা তাদের সঙ্গে সংঘাতে যাব না। বরং তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের নাগরিকদের যেন তারা ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই প্রচেষ্টাই আমাদের অব্যাহত থাকতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়-কালে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কারো সঙ্গে যুদ্ধ করব না, আমরা যুদ্ধ করতে চাই না, সবার সঙ্গে একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই। কিন্তু কেউ যদি আমাদের আক্রমণ করে তার যথাযথ জবাব যেন আমরা দিতে পারি এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যেন রক্ষা করতে পারি সে প্রস্তুতিটা সবসময় আমাদের থাকতে হবে।’

শেখ হাসিনা নিজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে রয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আলোচনা করেছি, চুক্তি সম্পাদন করেছি এবং তাদের (মিয়ানমার) সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এদেরকে (রোহিঙ্গা) নিজ দেশে ফেরত পাঠানোটাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা এখনো কাজ করে যাচ্ছি। মিয়ানমারের সঙ্গে আমরা ঝগড়া বাঁধাতে যাইনি।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। এই নীতিতেই তাঁর সরকার বিশ্বাসী এবং সেই নীতিতেই সরকার পরিচালিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক হচ্ছে তার প্রতিরক্ষা। একটা দেশকে কিভাবে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যায়, আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলোও এখান থেকেই কার্যকর করা হয়। আমাদের দেশের আবহাওয়া জলবায়ু থেকে শুরু করে অনেক কাজই এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সরকার গঠনের পর সবসময় এই মন্ত্রণালয়টি তিনি নিজের কাছেই রাখেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর ফলে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীকে যেমন আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা যাচ্ছে, তেমনই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে কাজ করারও একটা সুযোগ আমাদের রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এসময় ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তি এবং সমুদ্র সমস্যা সমাধানে তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, জাতির পিতাই এর শুরুটা করে যান। কিন্তু কেন যে পরবর্তী সরকারগুলো সেটা বাস্তবায়ন করেনি সেটা বোধগম্য নয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণে সশস্ত্র বাহিনীর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের কার্যক্রমসমূহ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাধীন-সার্বভৌম, সুখী, প্রগতিশীল, আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর/সংস্থাসমূহের প্রধানগণের সঙ্গে দাপ্তরিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি কিছুটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ব্যবহূত দপ্তর কক্ষকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং পরে তিনি পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) মো. আবুল কালাম আজাদ, সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. শামসুল হক, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত এসময় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, প্রতিরক্ষা সচিব আখতার হোসেন ভুঁইয়া, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এবং পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম হচ্ছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খেলার উন্নতির জন্য দেশের প্রায় পাঁচশ উপজেলার প্রতিটিতে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। গতকাল ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, ফুটবল জনপ্রিয় খেলা। এই খেলার যেন আরো উন্নতি হয় সেজন্য আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মিনি স্টেডিয়াম তৈরি করে দিচ্ছি। যাতে সব সময় আমাদের ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা প্র্যাকটিস করতে পারে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি তৈরি হয়ে গেছে।’

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট’ এবং ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট’ প্রবর্তন করে। ২০১৮ সালের দুই টুর্নামেন্টের ফাইনাল হয় বৃহস্পতিবার। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ কাপ জিতেছে সিলেটের হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ জিতেছে ময়মনসিংহের পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শেখ হাসিনা দুইটি টুর্নমেন্টের বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়ার আগে স্টেডিয়ামে বসে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের ফাইনাল খেলা দেখেন।

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের সমাপনী দিনে পুরস্কার বিতরণের সময় প্রধানমন্ত্রীর মায়াবী হাতে মুছে গেলো মেয়েদের চোখের পানি। বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে হয়েছে দুই বিভাগের ফাইনাল। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ময়মনসিংহের পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা। তারা ১-০ গোলে হারিয়েছে লালমনিরহাটের টেপুগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই কান্না শুরু করে টেপুগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা। কিছুতেই তাদের কান্না থামছিল না। স্কুলের শিক্ষকরাও যেন ব্যর্থ হচ্ছিলেন তাদের কান্না থামাতে। এমনকি পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে উঠেও কান্না করছিলেন তারা; কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে গিয়ে ছাত্রীরা পেল মায়ের স্নেহ। মুহূর্তেই ছোট ছোট মেয়েরা ট্রফি না পাওয়ার কষ্ট ভুলে গেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদর ও ভালোবাসায়। মেয়েদের গলায় পদক পরিয়ে প্রধানমন্ত্রী বুকে টেনে নেন এক একজনকে। আরেক হাত দিয়ে মুছে দেন কান্নারত মেয়েদের চোখের পানি। তাদের দিয়েছেন সান্ত্বনা, দিয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার উত্সাহ। মেয়েদের চোখের পানি মুছে দেওয়ার সেই দৃশ্য যখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ভেসে ওঠে তখন যেন আবেগ ছড়িয়ে যায় পুরো স্টেডিয়ামে।

অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।