বন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিত্সাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানামুখী আলোচনা। খোদ বিএনপি, ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এনিয়ে গুঞ্জণ রয়েছে। কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, উন্নত চিকিত্সার জন্য প্যারোলে মুক্তির ব্যবস্থা করে তাকে বিদেশে পাঠানো হতে পারে। এনিয়ে সরকার ও বিএনপির মধ্যে পর্দার আড়ালে সমঝোতার চেষ্টা চলছে বলেও অসমর্থিত নানা সূত্রে শোনা যাচ্ছে। তবে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, প্যারোলের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটার কোনো ভিত্তি নেই। একেবারেই উড়ো খবর। আমরা যারা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য রয়েছি, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের (তারেক রহমানের) সঙ্গে যাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে, কিংবা আমরা যারা ম্যাডামের (খালেদা জিয়ার) পক্ষে আদালতে আইনি লড়াই করছি, তারা কেউ প্যারোলের বিষয়ে কিছুই জানি না। কোত্থেকে এই ধরনের কথা ছড়ানো হচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছি না।’
খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করার বিষয়টি প্রথমে সামনে আনেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহমুব হোসেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘প্যারোল ছাড়া আইনি লড়াই করে আপাতত তাকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।’ এ ব্যাপারে মওদুদ আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা মাহবুব সাহেবের ব্যক্তিগত মত, তিনি লিগ্যালি হয়তো কথাটা বলে থাকতে পারেন। তবে এটার সঙ্গে দলের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই।’
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন কয়েকদিন আগে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি একসময় খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির কথাটা বলেছিলাম। তখন বিএনপির হাইকমান্ড এটিকে সহজভাবে নেয়নি। তারা মনে করেছিলেন এতে বিএনপির রাজনীতির পরাজয় হবে।’
প্রসঙ্গত, গতবছর ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিএনপি চাইলে বিদেশে চিকিত্সার জন্য খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
এর আগে ১/১১- এর সরকারের সময়েও খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। তখন তিনি একবার প্যারোলে মুক্তি নিয়েছিলেন। মা তৈয়বা মজুমদার মারা গেলে তাকে দেখতে কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এ-ও শোনা যায়, সেইসময় খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি হননি।
একাধিক সূত্রের দাবি, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ১/১১ এর সময় খলেদা জিয়া রাজি হননি বলে এবারও যে রাজি হবেন না সেটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ বর্তমানে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় গুরুতর। তাছাড়া আগে তিনি দন্ডপ্রাপ্ত ছিলেন না। এখন দুর্নীতির দুই মামলায় ১৭ বছর দন্ডিত হয়ে তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি। তাছাড়া এবার খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরাও প্যারোলে মুক্তি নিয়ে তাকে বিদেশে চিকিত্সা করাতে চাচ্ছেন বলেও এসব সূত্র দাবি করছে।
তবে প্যারোলের এই আলোচনা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন কয়েকদিন আগে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো প্রস্তাব আসেনি।
বিএনপির কেউ কেউ এমপি হিসেবে শপথ নিতে আগ্রহী
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের দুই সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর (মৌলভীবাজার-২) ও মোকাব্বির খান (সিলেট-২) এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিএনপি থেকে নির্বাচিতদের কেউ কেউও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। তারা স্থানীয় নেতা-কর্মী ও এলাকার মানুষের কাছ থেকে সংসদে যাওয়ার পক্ষে পরামর্শও নিচ্ছেন।
সূত্রমতে, সংসদে যাওয়ার পক্ষে- বিএনপির নির্বাচিত এমন কয়েকজনের সঙ্গে গণফোরামের মোকাব্বির খানের কথা হয়েছে। মোকাব্বির গতকাল ইত্তেফাককে জানান, ‘বিএনপির নির্বাচিত কয়েকজনের সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হয়েছে, তারাও সংসদে যাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক। তারা আমাদের সঙ্গে চা-চক্রেও বসতে চাচ্ছেন।’
৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের মোট আটজন বিজয়ী হন। এরমধ্যে গণফোরামের দলীয় মনোনয়নে ও বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচিত সুলতান মনসুর দল-ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত অমান্য করে গত ৭ মার্চ শপথ নেন। এ কারণে দল ও ফ্রন্ট থেকে তাকে ওইদিনই বহিষ্কার করা হয়েছে। সুলতান মনসুরের পথ ধরে গণফোরামের দলীয় মনোনয়নে ও নিজ দলের প্রতীক ‘উদীয়মান সূর্য’ প্রতীকে নির্বাচিত মোকাব্বির খানও মঙ্গলবার শপথ নেন।
বিএনপির দলীয় মনোনয়নে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে যে পাঁচজন নির্বাচিত হয়েছেন তারা হলেন- বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বগুড়া-৪ আসনে মোশাররফ হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে মো. হারুন অর রশীদ, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে জাহিদুর রহমান ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া।
ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমানের দাবি, এলাকার ৯০ ভাগ নেতা-কর্মী-সমর্থক তার সংসদে যাওয়ার পক্ষে। বগুড়া-৪ আসনে বিজয়ী মোশাররফ হোসেন বলছেন, শপথের বিষয়ে তার এলাকার নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভক্ত মত আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াও সংসদে যেতে আগ্রহী। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে রাজি নন তিনি।
‘গেট আউট’ বলে মোকাব্বিরকে বের করে দিলেন ড. কামাল
এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মোকাব্বির খান গতকাল বিকাল তিনটার দিকে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে মতিঝিলে তার আইনি চেম্বারে দেখা করতে যান। তাকে দেখেই রেগে উঠে ড. কামাল বলেন, ‘অসভ্য, গেট আউট, গেট আউট। এখান থেকে বের হয়ে যাও। তুমি কারও কথা শোনোনি। তুমি আর কখনও এখানে আসবে না, আমার বাসায়ও আসবে না। চলে যাও, তোমার মুখ দেখতে চাই না।’ এসব কথা বলতে-বলতে ড. কামাল এক পর্যায়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। পরে ড. কামালের নির্দেশে মোকাব্বিরকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার সময় ড. কামালের চেম্বারে উপস্থিত ছিলেন গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীসহ আরো কয়েকজন। এ ব্যাপারে পরে মোকাব্বির টেলিফোনে ইত্তেফাককে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি স্যারের চেম্বারে গিয়েছিলাম’। তবে তাকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন।
মোকাব্বিরকে শোকজ নোটিশ দেবে গণফোরাম
গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী গতকাল ইত্তেফাককে জানান, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেওয়ায় মোকাব্বির খানকে শোকজ নোটিশ পাঠানো হবে। যেহেতু মোকাব্বির খান গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য তাই তাকে আগে শোকজ নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলে আইনি পদক্ষেপ নেবে গণফোরাম।
সুলতান মনসুরের এমপি পদ বাতিলে স্পিকারকে চিঠি দেবে গণফোরাম
সুলতান মনসুরের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেবে গণফোরাম। সুব্রত চৌধুরী গতকাল ইত্তেফাককে জানান, দল থেকে আমরা প্রথমে সংসদের স্পিকারকে চিঠি দেব। আইন অনুযায়ী স্পিকার সেটা নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে (ইসি) পাঠাবেন। স্পিকার যদি ইসিতে না পাঠান তাহলে আমরা হাইকোর্টে যাব।