থামছে না শ্রমজীবী শিশু হত্যা

৫ বছরে নির্যাতনের শিকার ১৩ হাজার, নিহত প্রায় দেড় হাজার শিশু

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এর

তথ্য মতে নির্যাতনে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা

২০১৬ সালে ২৬৫ জন

২০১৫ সালে ২৯২ জন

২০১৪ সালে ৩৬৬ জন

২০১৩ সালে ১৮০ জন

২০১২ সালে ২০৯ জন

 

দেশে কোনোভাবেই থামছে না শ্রমজীবী শিশু নির্যাতন ও হত্যা। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলেও সামাজিক অসুস্থতার কারণে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৩ হাজার ১২ জন শিশু। এর মধ্যে মারা গেছে প্রায় দেড় হাজার শিশু। শিশুদের প্রতি বড়দের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি ও সমাজের অস্থিরতা দূর করতে না পারলে আইন করেও নির্মম এই হত্যাকাণ্ড ঠেকানো যাবে না বলে মত দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।   

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম-বিএসএএফ এর তথ্য মতে: ২০১৬ সালে ২৬৫ শিশু হত্যার শিকার হয়। এছাড়া ২০১৫ সালে ২৯২, ২০১৪ সালে ৩৬৬, ২০১৩ সালে ১৮০ এবং ২০১২ সালে ২০৯ শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু হত্যার কারণগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যদের সাথে বিরোধ এবং শত্রুতার বলি হয়েছে নিরীহ শিশু। এ ছাড়াও দরিদ্র শ্রমজীবী শিশুদের তুচ্ছ কারণে বা চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলার ঘটনা অব্যাহত ভাবে লক্ষ্যণীয়।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ২০১৬ সালে ৩৬ শিশু হত্যা মামলার রায় পাওয়া গেছে; যার ৩টি ২০১৫ সালে এবং বাকি সব গুলোই ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সংঘটিত। ২০১৫ সালের নভেম্বরে রাজন-রাকিব হত্যা মামলার ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসে দ্রুততম রায় হয়েছিল।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা: কে বা কারা গৃহকর্তার টাকা চুরি করেছিল, আর সেই দোষ পড়ে শিশু গৃহকর্মী স্বর্ণার ঘাড়ে। তার ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। ঘটনাটি ঘটে গত ২৭ জুন নেত্রকোনা পৌরসভার বলাইনগুয়া গ্রামে। গৃহকর্তা টিটু মিয়া ও তার স্ত্রী নাসরিন সুলতানা আট বছরের স্বর্ণাকে লোহার রড গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দেয়; হাত পায়ের নখ সুঁচ দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে এবং বাসায় আটকে রেখে নির্যাতন করে। স্বর্ণা ওই গ্রামের দিনমজুর রফিকুল ইসলামের মেয়ে।

সমবয়সী চার বন্ধুর মধ্যে কে বড়, কে ছোট, এই তর্কের দ্বন্দ্বে গত ১ জুলাই রাজধানীর আদাবরে সজল নামের এক কিশোরকে পিটিয়ে ও মাথায় আঘাত করে হত্যা করে তারই বন্ধুরা। সজল শেখেরটেক এলাকায় দর্জির দোকানে কাজ করতো। একই দিনে ঝালকাঠির রাজাপুরের বড়ইয়া ইউনিয়নের আরুয়া সোনারগাঁও গ্রামের ১২ বছরের শিশু রাজু হাওলাদারকে টাকা চুরির অভিযোগে ওই গ্রামেরই তিন বখাটে পরিত্যক্ত ঘরের আড়ার সঙ্গে রশি দিয়ে উল্টো করে ঝুলিয়ে হাত-পা ও চোখ বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, চলতি বছর ৩ এপ্রিল সাভারে একটি কয়েল কারখানায় মেশিনে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যু হয় ১২ বছরের রায়হানের। ৬ মে রাজধানীর মিরপুরে ৮ বছরের শিশু গৃহশ্রমিক ফাতেমা আক্তার শরীরে গরম পানিতে ঝলসে দেওয়া হয়। সাভারে ১০ বছরের শিশু গৃহকর্মীর ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের খবর পাওয়া যায় ১৮ মে। লক্ষ্মীপুরে ১২ বছরের শিশু শ্রমিককের পায়ু পথে বাতাস দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায় ২৬ মে। আর শিশু-কিশোরী ধর্ষণ তো প্রতিদিনই চলছে। এর আগে ২০১৫ সালে খুলনায় রাকিব, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে নারায়ণগঞ্জে সাগর বর্মণ এবং ডিসেম্বর মাসে সোনারগাঁয়ে ইয়ামিন নামের শিশু শ্রমিককে পায়ু পথে বাতাস দিয়ে হত্যা করা হয়।

তথ্য মতে, ২০১৫ সালে ৯০ শিশুকে এবং ২০১৬ সালে ১০৬ শিশুকে চুরির অপবাদে নির্মমভাবে পিটিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে; যাদের অধিকাংশই দরিদ্র শ্রমজীবী শিশু।

কেন এই নির্যাতন :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন ইত্তেফাককে বলেন, সমাজের মানুষ শিশু অধিকার সম্পর্কে সচেতন না। যে ধরনের সহিংসতা হচ্ছে  তার তাত্ক্ষণিক বিচারও হয় না। সব মানুষের মধ্যে পশুত্ব থাকে; তবে যেসব মানুষ শিশু নির্যাতন করছে তাদের মধ্যে পশুত্বটা বেশি থাকে। এ কারণে এই নির্যাতন ঘটছে। তিনি বলেন, আগে অপরাধ দেখলে সামাজিকভাবে অনেকে বাধা দিতো, সহযোগিতায় এগিয়ে আসত কিন্তু এখন কেউ এগিয়ে আসে না। কারো খবর কেউ রাখে না। জটিল সমাজের এসবই বৈশিষ্ট্য।

এসব ঘটনা প্রতিরোধে এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ পারিবারিকভাবে যদি শিশু অধিকার ও শিশু সুরক্ষা আইনগুলো শেখানো হতো; তাহলে শিশুর ওপর এ ধরনের নিষ্ঠুর নির্যাতন কমে আসতো। শিশু অধিকার রক্ষায় যে আইনগুলো আছে তা প্রয়োগ করা হয় না। এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে সচেতনতা দরকার। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার। তিনি বলেন, আমাদের দেশে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটা, যে কারণে শিশুদের জন্যে আলাদা ভয়েজ রেইস করার জায়গা নেই। মন্ত্রণালয় মনে করে, মায়ের অধিকারের সঙ্গে শিশু অধিকার চলে আসবে। যে কারণে জরুরি প্রয়োজনেও শিশুর নিরাপত্তা দেওয়া হয় না।

সামাজিক অস্থিরতাকে দরিদ্র ও শ্রমজীবী শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যার প্রধান একটি কারণ মনে করেন বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারপারসন এমরানুল হক চৌধুরী। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, যারা শিশুশ্রমিক নিয়োগ দেন তাদের শিশু অধিকার ও আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। শিশু নির্যাতন করলে যে শাস্তি হয় তা তারা জানে না। যারা শিশু নির্যাতন করে, তারা আসলে খারাপ লোক। আর শিশুরা দুর্বল বলেই মার খাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ, বাবা-মায়ের সচেতনতা ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানো দরকার।

ইত্তেফাক/নূহু