দখলবাজদের গ্রাসে রাজধানীতে পল্লবীর কালশী খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। রূপনগর এলাকার ভোলা বস্তি থেকে শুরু হয়ে এই খাল বাউনিয়ায় মাটিকাটা এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মাটিকাটা এলাকায় একটি ব্রিজ নির্মাণ করে খালের গতি বন্ধ করা হয়েছে। মাটিকাটা এলাকায় কালশী খালের যে উন্মুক্ত অংশ ছিল সেটিও মাটি ভরাট করে জমি বেচাকেনার কাজ চলছে। সাংবাদিক কলোনির দিকে কালশী খাল পুরো দখল হয়ে গেছে। ঐ এলাকা বৃষ্টি হলেই কোমর পানিতে নিমজ্জিত হয়। মাত্র ২০ বছর আগেও সাড়ে ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও গড়ে ১শ ফুট প্রস্থের বহমান ছিল কালশী খাল। কিছু অংশে ওয়াসা ১০ ফুট প্রস্থের একটি ড্রেন নির্মাণ করে খালশী খালের অস্তিত্ব রেখেছে।
ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান গতকাল ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, ঢাকায় এক সময় ৪৭টি খাল ছিল। ২৬টি খালের অস্তিত্ব টিকে আছে। এর মধ্যে ১৩টি খালের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ওয়াসার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে খাল উদ্ধারের অভিযান শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ১১টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। দখল হয়ে যাওয়া দুটি খালের মধ্যে একটি কালশী খাল। এই খাল উদ্ধারে শিগগির অভিযানে নামবে ওয়াসা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ১৫ বছর আগেও ভারি বৃষ্টিতে মিরপুর ও পল্লবীর নিম্নাঞ্চল ডুবত না। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ৩০ মিনিট ভারি বৃষ্টি হলেই এই এলাকা কোমর পানিতে ডুবে যায়। জমে থাকা পানি নেমে যেতে ২/৩ দিন সময় লাগে।
পল্লবীর বাসিন্দা ও স্থানীয় বর্ণ ক্লাবের ক্রীড়া সম্পাদক কালাম হোসেন চৌধুরী বলেন, ২০ বছর ধরে দেখছি কীভাবে একটি খাল বিলীন হয়ে গেল। বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে শুর করে ভোলা বস্তি, তাঁতিরটেক, মুক্তিযোদ্ধা হোসেন মাতবরের বাড়ি, মুসলিম বাজার ও সিরামিক রোড এলাকায় খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাউনিয়া বাঁধ সংলগ্ন মাটিকাটা এলাকায় কে বা কারা মাটি ভরাট করে প্লট তৈরি করছে।
মাটিকাটা এলাকায় দেখা গেছে নতুন ব্রিজ পর্যন্ত দখলবাজি চলছে। দখলবাজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। এলাকার এক বাসিন্দা এই প্রতিবেদকে মাটিকাটা এলাকার একটি স্থানে নিয়ে দেখিয়ে দেন কীভাবে মাটি ভরাটের কাজ চলছে। তিনি বলেন, কালশী ভেড়িবাঁধের সিএস ৩২৩৩ নং দাগ ও আরএস ১০১৪৯ দাগের বিশাল অংশের জমিটি খালের জমি। মালিকানা ওয়াসার। অথচ এই অংশ গত ৬ মাস ধরে মাটি ভরাট করে প্লট আকারে জমি বিক্রি করা হচ্ছে। থানায় অভিযোগ দিলে উল্টো এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে দখলবাজরা মামলা ঠুকে দিচ্ছে।
পল্লবী থানার ওসি দাদন ফকির বলেন, ঐসব স্থানের দখল নিয়ে আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা চলছে। তবে খালের জমি কি না এটা আদালতের বিষয়।
কালাপানি এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, বছর দেড়েক আগে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক এলাকায় এসে কালশী খালের পরিস্থিতি দেখে গেছেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, যেভাবেই হোক তিনি কালশী খাল পুনরুদ্ধার করবেন। এই দেড় বছরের মধ্যে সিটি কর্পোরেশন থেকে কালশী খালের ব্যাপারে কোনো খোঁজই নেওয়া হয়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, খাল রক্ষার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনকেই নিতে হবে। কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ঢাকার খালগুলো দ্রুত দখলমুক্ত ও আবর্জনামুক্ত করা না হলে সব খাল হারিয়ে নগরী হয়ে পড়বে পুরোপুরি বসবাসের অনুপযোগী। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিটি খালকেই হাতিরঝিলের মতো নান্দনিক রূপ দিয়ে সব খাল ঘিরেই বিনোদনের চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করেন পরিকল্পনাবিদরা।
ইত্তেফাক/এমআর