স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি চিকুনগুনিয়া ঝুঁকিতে রয়েছে আজিমপুর এলাকা। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসা রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপ্রবণ এলাকার মাত্রা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ দিকে, আজিমপুর এলাকা ঝুঁকিতে থাকলেও ওই এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও নেই সিটি করপোরেশনের নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার উপদ্রব থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে হলে বছরব্যাপী চালাতে হবে নিধন কার্যক্রম। অর্থাত্ নির্দিষ্ট সময়ে মশা নিধন কর্মসূচি চালালে মশার হাত থেকে পরিত্রাণ মিলবে না।
আজিমপুর কলোনি ঘুরে দেখা যায়, কলোনির আবাসিক কোয়ার্টারের পাশেই ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। ড্রেন পরিষ্কার করা হয় না দীর্ঘদিন। পুকুরের মধ্যেও হচ্ছে মশার বংশ বিস্তার। কলোনির বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা নোংরা পানিতেও মশা দেখা গেছে। কলোনির ভিতরে অবস্থিত অগ্রণী স্কুল ও কলেজের মাঠে জমে আছে পানি। শিক্ষকরা বলছেন, এই মাঠ মশা উত্পাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে।
অগ্রণী স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ রেজাউজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই স্কুলের মাঠে পানি জমে যায়। অনেক সময় পানি ক্লাস রুমেও উঠে। পানি জমে থাকায় মশার বংশ বিস্তার হচ্ছে। পানি কেন সরে না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, পানি সরে যাওয়ার ড্রেনের মুখ বন্ধ করে অবৈধ বাসা বানিয়েছে কিছু সরকারি কর্মচারী। এ সব বাসা বহিরাগতদের ভাড়া দিয়ে কলোনির নিরাপত্তাও বিঘ্নিত করছেন অভিযুক্তরা। একাধিকবার তাদের বলার পরেও তারা ড্রেন খুলে দেয়নি।
কলোনির বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ময়লার ভাগাড় যেনো পুরো কলোনি। তবে এজন্য বাসিন্দাদের অসচেতনতাকেই দায়ী করলেন তিনি। কলোনিতে গজিয়ে উঠা আগাছা পরিষ্কার না করায় মশা-মাছির বংশবৃদ্ধি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কলোনি ছাড়াও মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ পুরো আজিমপুরের মানুষ। বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ছয় মাসে মাত্র একবার সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওষুধ ছেটাতে দেখেছেন তারা। তবে চিকুনগুনিয়া বিস্তারের পরে গতকাল রবিবার সিটি করপোরেশনের কর্মীরা এই এলাকায় লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
গতকাল সকালে অগ্রণী স্কুল ও কলেজে চিকুনগুনিয়া বিষয়ক একটি সচেতনতামূলক কর্মশালা করেছে দক্ষিণ সিটির অঞ্চল-৩। এতে বক্তব্য রাখেন অঞ্চল-৩ এর নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আনসারুজ্জামান, অগ্রণী স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ রেজাউজ্জামান ভুঁইয়া ও দক্ষিণ সিটির ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ সালাউদ্দিন বলেন, ছুটির দিন বাদে প্রতিদিনই সকাল-বিকাল মশা নিধনে কাজ করছেন করপোরেশনের কর্মীরা।
এ দিকে রাজধানীতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে চিকুনগুনিয়া জ্বর। ডেঙ্গুগুতেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। কিন্তু এই দুটি জ্বরের ভাইরাসের বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নেই সিটি করপোরেশনের জোরালো পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার উপদ্রব থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে হলে বছরব্যাপী চালাতে হবে নিধন কার্যক্রম।
তবে দেখা যায়, মশার বংশ বিস্তারের সময়কালে মশক নিধনের পরিকল্পনা থাকলেও সেটা বাস্তবায়নে আন্তরিক নয় করপোরেশন। চিকুনগুনিয়া ব্যাপক বিস্তারের পরে করপোরেশন কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর ৫০টি এলাকায় জরিপ করেছে। এতে দেখা যায়, প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ রয়েছে। জরিপের প্রতিবেদনে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন সংখ্যাতত্ত্বে লাল চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে। এতে চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণের দিক থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৩টি এলাকার মধ্যে ২৭টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২১টি এলাকার মধ্যে ১৭টি লাল চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। জরিপে বেশি ঝুঁকিতে আজিমপুর রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এ দিকে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন চিকিত্সকরা। বছরব্যাপী পরিকল্পিত মশা নিধন কার্যক্রম চালানোর ওপরেও জোর দিচ্ছেন তারা। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, মশা নিধন কার্যক্রম ঠিকই আছে। তবে রাজধানীর আশপাশে মশা নিধনের ব্যবস্থা না থাকার কারণেই কমছে না মশার উপদ্রব।