ড. হাফিজ মুহম্মদ হাসান বাবু
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বদলে দিতে যাচ্ছে সারা বিশ্বের মানুষের জীবন। অভূতপূর্ব এ পরিবর্তন মানুষের জীবনকে করবে সহজতর এবং একই সঙ্গে জীবনের গতি হবে এখনকার চেয়ে আরো অনেক বেগবান। সারা বিশ্বে (4th Industrial Revolution-4 IR) নিয়ে প্রচুর আলোচনা এবং গবেষণা হচ্ছে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence-AI) নিয়ে মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরো বাড়ছে। এমন অনেক কাজ কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা করা হচ্ছে যা আগে কখনো ভাবতেও পারেনি মানুষ। আজ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকেও প্রস্তুতি নিতে হবে ভবিষ্যতের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্যে এবং ভবিষ্যত্ বিশ্বের একটি উন্নত ও অগ্রগামী জাতি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।
শিল্প বিপ্লব
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা জানতে হলে আমাদের আগে জানতে হবে আজ পর্যন্ত বিশ্বের ইতিহাসের ঘটে যাওয়া শিল্প বিপ্লবের গল্পগুলো। বিশ্বে মোটামুটি ১৭৫০-১৮৫০ সাল এই সময়কালে কৃষি এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থা হতে আধুনিক শিল্পায়নের দিকে গতি শুরু হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে। আর এ পরিবর্তনই শিল্প বিপ্লব নামে পরিচিত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনটি শিল্প বিপ্লবে পরিবর্তন হয়েছে সারা বিশ্বের পরিক্রমা। ১৭৬০ সালে শুরু হওয়া শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে শিল্পায়নের সূত্রপাত। ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন তৈরির মাধ্যমে যা ব্যাপক কলেবরে বৃদ্ধি পায়। ১৮৭০ সালে বিদ্যুত্ আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ পেয়েছে আলোকিত বিশ্ব। ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিষ্কার হওয়ার ফলে কায়িক শ্রমের বিপরীতে মস্তিষ্ক নির্গত জ্ঞানের বিপ্লব ঘটেছে এবং শিল্পোত্পাদনের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।
কিন্তু এই তিন বিপ্লবকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করেছে নতুন এক পরিবর্তনের ছোঁয়া, যাকে সবাই ডিজিটাল বিপ্লব বলে সম্বোধন করছেন। অনেকে এটাকে চতুর্থ বিপ্লব বলেও আখ্যায়িত করছেন। এই বিপ্লবের পুরোধা জুড়ে রয়েছে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্য-প্রযুক্তির সকল অনুষঙ্গ।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা ডিজিটাল বিপ্লব
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলতে যেটি বোঝানো হচ্ছে তা হলো সমাজ এবং অর্থনীতির বিভিন্ন অনুষঙ্গের নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত রূপান্তর। অর্থাত্ প্রতিটি ক্ষেত্রে রোবটিক্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কীভাবে মানুষের কল্যাণে আসতে পারে। এছাড়াও স্বয়ংক্রিয় যান, ৩-ডি বা ত্রিমাত্রিক ছবি, ন্যানো বা অতি ক্ষুদ্র প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখা কীভাবে মানব জীবনকে বদলে দিতে পারে ও কীভাবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতে পারে এ সব কিছুই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
ডব্লিউইএফের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান ক্লাউস শোয়াব চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে নিজের লেখা একটি প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমরা চাই বা না চাই, এত দিন পর্যন্ত আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম এবং চিন্তা-চেতনা যেভাবে চলেছে, তা বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি’। ডিজিটাল বিপ্লব সম্পর্কে বিস্তর ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালিয়েছেন ক্লাউস শোয়াব। স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বের তথ্য-প্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন, ইন্টারনেট অব থিংস, যন্ত্রপাতি পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, রোবোটিকস, জৈবপ্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো বিষয়গুলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সূচনা করেছে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্বব্যাংকের ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনেও ডিজিটাল বিপ্লব সম্পর্কে নানা বিষয় উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন একদিনে বিশ্বে ২০ হাজার ৭০০ কোটি ই-মেইল পাঠানো হয় এবং গুগলে ৪২০ কোটি বার বিভিন্ন বিষয় খোঁজা হয়। একযুগ আগেও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ পরিবর্তনগুলো ছিল অকল্পনীয়।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হিসেবে ডিজিটালাইজেশন এরই মধ্যে সর্বক্ষেত্রে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আগামী ১০ বছরে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে এমন সব পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হবে, যা এর আগে কখনো সম্ভব হয়নি। বিশ্বের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে দুই ধরনের মত পাওয়া যাচ্ছে। একদল বিশেষজ্ঞ বলছেন, এতে সব মানুষেরই আয়ের পরিমাণ ও জীবনমান বাড়বে। বিশ্বের পণ্য সরবরাহ প্রক্রিয়ায়ও ডিজিটাল প্রযুক্তি আনবে ব্যাপক পরিবর্তন। এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য পাঠানোর খরচ অনেক কমে আসবে এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে।
অন্য একদল অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বের অসাম্য ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরো দুর্বিষহ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষের অনেক কাজ রোবট ও যন্ত্রপাতি দিয়ে করা হবে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা সমস্যা তৈরি করবে। এছাড়া শ্রমবাজারে অল্প কর্মদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ও বাজার কমে যাবে যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সমস্যায় ফেলবে।
ডিজিটাল বিপ্লবের আরো একটি সমস্যা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশ্বে সম্পদ বৈষম্য আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বাড়বে বলে অনেকের আশঙ্কা। ডিজিটাল প্রযুক্তির আবিষ্কারক এবং বিনিয়োগকারী দেশগুলো এর থেকে যতটা লাভবান হবে, অন্য দেশগুলো তা থেকে বঞ্চিত হবে। বিষয়টিকে বিজয়ী পক্ষের সব ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল বিপ্লবের প্রভাব হবে ব্যাপক। ব্যতিক্রমী পণ্য সেবার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল গ্রাহক চাহিদা পূরণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সরকার পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণেও ডিজিটাল বিপ্লব আনবে বড় পরিবর্তন। প্রযুক্তি-বিপ্লব সরকারি সেবাকে একদিকে সাধারণ মানুষের হাতেরনাগালে নিয়ে আসবে এবং অন্যদিকে মারণাস্ত্রের সহজলভ্যতা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঝুঁকিও বাড়াবে। নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবই যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করবে সে আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বের আলোড়নের ছোঁয়া বাংলাদেশেও লাগছে। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই যথাযথ পরিকল্পনা নিতে না পারে তবে ভবিষ্যতের জন্যে অনেক সমস্যা হবে। ভবিষ্যতে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে কিনা, প্রযুক্তি উন্নতির সাথে সাথে চাকরির বাজারে কোনো সমস্যা হবে কিনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যত্ কী- এসব নিয়ে কথা বলেছেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন। তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার চাকরি এখনো পর্যন্ত আছে। কোনো সুপার রোবট এসে আমার জায়গা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়াবে এমনটা হতে অনেক সময় বাকি এবং আদৌ হবে কিনা সেটা নিয়ে এখনই বলা যাচ্ছে না।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং নিয়ে এখন অনেক বেশি কাজ হচ্ছে। এই দুটি বিষয় নিয়ে গবেষণার ফলে মানুষের বেশ কিছু কর্ম উত্স তাদের জন্য আর বহাল থাকছে না। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবার এবং সেখানে যারা শিল্প-কারখানায় কাজ করে তাদের মধ্যে চাকরি চলে যাওয়ার একটি ভয় বেশি কাজ করে। কিন্তু যেসব কাজে মানুষের ইন্দ্রিয়ের প্রয়োজন হয় এবং যেসব কাজের জন্য একটি নিপুণ পরিচালনার প্রয়োজন পড়ে, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করলে ঠিক ফল পাওয়া যাবে না। যেসব কাজ মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং সৃজনশীলতার উপর নির্ভর করে, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ আদৌ সম্ভব নয়। তবে আশার কথা হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জাতীয় কৌশলপত্র তৈরি করছে সরকার। প্রাথমিক খসড়া তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চূড়ান্ত খসড়া আনা হবে কয়েক মাসের মধ্যে। ২০১৯ সালের মার্চের শুরুর দিকে এই খসড়া তৈরি শুরু হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের নভেম্বরে। ওই মাসে ‘ডেভেলপমেন্ট অব ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ তৈরিতে পদ্ধতিগত কাজগুলো শুরু করে সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন বা এটুআই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে পরবর্তী পাঁচ বছরে জোর দেয়ার কথা বলেছেন। এখন জাতীয় পর্যায়ে একটি স্ট্র্যাটেজি গাইড লাইনের মাধ্যমে পরবর্তী পাঁচ বছরে আমরা কী করবো তা নির্ধারণ করা এবং সে অনুযায়ী ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশনের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিতপূর্বক সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হবে আমাদের কাম্য। আমরা চাই বাংলাদেশ যেন ডিজিটাল যুগের অগ্রপথিক হতে পারে। আমাদের এই দেশ অনেক সম্ভাবনার দেশ।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি ও প্রেসিডেন্ট, ইন্টারনেট সোসাইটি, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার