আলজেরিয়ায় কাঙ্খিত রাজনৈতিক পরিবর্তন কি সম্ভব?

তাহার বয়স ৮২ বত্সর। বয়সের ভারে এমনিতেই ন্যূব্জ। তাহার ওপর ২০১৩ সালে স্ট্রোক করিবার পর শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল। চলাফেরার ক্ষেত্রে হুইলচেয়ারই নিত্যসঙ্গী। সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নিতে পারিতেন না। তবে তাহার ছবি ব্যবহার করিয়া ‘প্রতীকী উপস্থিতি’ হিসাবে কাজ চালানো হইত। এইজন্য তাহাকে ‘জীবন্ত লাশ’, ‘দ্য ফ্রেম’ ইত্যাদি বলিয়া কটাক্ষ করা হইত। তিনি উত্তর আফ্রিকার একটি দেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে ২০ বত্সর ধরিয়া ক্ষমতায় ছিলেন। এই বয়সের ভার ও শারীরিক অক্ষমতার পরও তিনি ক্ষমতা ছাড়িতে রাজি ছিলেন না। এই অবস্থার মধ্যেও তিনি পঞ্চমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়া ফেলিয়াছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। শেষপর্যন্ত জনগণের একমাসের তুমুল আন্দোলনে ও তাহার প্রতি সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আহমেদ গায়েদের সমর্থন প্রত্যাহারের পর তিনি পদত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। তিনি সদ্য বিদায়ী আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেল আজিজ বুতেফলিকা।

আব্দেল আজিজ বুতেফলিকা সাংবিধানিক পরিষদের প্রধান তায়েব বেলাইজের নিকট পদত্যাগপত্র দিয়া আপাতত ক্ষমতার দৃশ্যপট হইতে বিদায় লইয়াছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাহার ও তাহার অনুসারীদের প্রভাব এখনো বিদ্যমান। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এখন মূল ক্ষমতা রহিয়াছে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের প্রধান আবদেল কাদের বেন সালাহর নিকট। কিন্তু তিনি বুতেফলিকারই একান্ত ঘনিষ্ঠ। কিছুদিন আগেও নির্বাচনে বুতেফলিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। এইজন্য সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীরা প্রেসিডেন্টপন্থি সব সরকারি কর্মকর্তার পদত্যাগ দাবি করিয়াছেন। তাহারা বিদায়ী প্রেসিডেন্টের আরেকটি ‘ছায়া’ সরকার চাহেন না। বিরোধীদের অনেকে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি জানাইয়াছেন। বিক্ষোভকারীদের যাহারা নেতৃত্ব দিতেছেন, তাহারা বয়সে তরুণ। তাহারা গত দুই দশকের স্বৈরশাসনে বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ। দেশটির ৭০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই তরুণ এবং ইহার অনূর্ধ্ব ৩০ বত্সর বয়সীদের প্রতি চারজনে একজন বেকার। কিন্তু এই তরুণ আন্দোলনকারীরা বুতেফলিকাকে শিখণ্ডী রাখিয়া ডিপ স্টেট তথা সেনাবাহিনী এবং ব্যবসায়ী, এলিট শ্রেণি ও সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে গড়িয়া ওঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থার কতটা আমূল পরিবর্তন করিতে পারিবেন—তাহা এখনো অনিশ্চিত। কেননা আরব বসন্তের পর মিশর ও তিউনিসিয়াসহ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক গতিবিধির অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নহে। 

১৯৬২ সালে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভকারী আলজেরিয়ার স্বৈরশাসনের ইতিহাস সুদীর্ঘ। বিশেষত ১৯৯১ সালে স্থানীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থি এফআইএসের বিজয়ের পর ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে তাহাদের নিশ্চিত বিজয় ঠেকাইতে সেনাবাহিনী পশ্চিমা দেশসমূহের সমর্থনে সেই নির্বাচন বাতিল করিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। ইহার পর দেশটিতে এক দশক ধরিয়া চলে গৃহযুদ্ধ যেখানে প্রায় দুই লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এমতাবস্থায় সারা বিশ্বের গণতন্ত্রকামীরা আলজেরিয়া নিয়া আশাবাদী হইলেও দেশটিতে কাঙ্খিত পরিবর্তন কতটা আসিবে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা কঠিন। সেখানে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হইবে তাহা এখনো পরিষ্কার নহে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হস্তক্ষেপমুক্ত অবস্থানে তাহারা যে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার পক্ষাবলম্বন করিবেন না, তাহা বলা যায় না।