‘ছাইটা হলো স্মৃতি আর আগুনটা বর্তমান’—বলেছিলেন সমরেশ মজুমদার। আমরা আপাতত আগুন ও ছাই দুটো নিয়েই আছি। অগ্নি, আগুন, বহ্নি, অনল, পাবক, দাহন। একই জিনিসের ভিন্ন নাম। মানুষের জীবনে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আগুন কীভাবে সৃষ্টি হলো? গ্রিক উপকথা অনুযায়ী দেবতাদের রাজা জিউস আরেক দেবতা প্রমিথিউসকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মানুষ বানাবার। প্রমিথিউস তার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মানুষ বানিয়েছিলেন। কিন্তু শর্ত ভঙ্গ করার জন্য জিউসের সঙ্গে প্রমিথিউসের দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং রাগ করে জিউস মানবজাতির কাছ থেকে আগুন কেড়ে নেয়। কিন্তু মানবদরদী প্রমিথিউস জিউসের ছেলে হেফেস্টাসের কাছে সংরক্ষিত আগুন চুরি করে মানবজাতিকে পুনরায় দান করে। যার ফলে মানবজাতি সভ্যতার দিকে এগুতে থাকে। এর ফলে ভয়ঙ্কর শাস্তি নেমে আসে। তবু মানব শুভাকাঙ্ক্ষী প্রমিথিউস পিছপা হয়নি। গ্রিক উপকথা অনুযায়ী প্রমিথিউসই মানুষ সৃষ্টি এবং মানুষের হাতে আগুন তুলে দেওয়ার জন্য দায়ী!
আদি মানবেরা আগুন আবিষ্কার করেছিলো কয়েক লাখ বছর আগে। ক্রমান্বয়ে মানুষ আগুন নিয়ন্ত্রণ করে খাবার ঝলসে খেতে, তাপ ও আলো পেতে এবং শিকারীদের দূরে রাখতে শিখল। আগুন মানব জীবনে এত বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, কিছু মানুষ আগুনের পূজা পর্যন্ত করত। বৈদিক যুগের তিন প্রধান দেবতার একজন হলেন অগ্নি; তিনি মর্ত্যের দেবতা, অন্য দু’জন হলেন স্বর্গের ইন্দ্র এবং অন্তরীক্ষের বরুণ। অগ্নিকে বলা হয় দেবতাদের মুখ বা দূত। কারণ, যজ্ঞে যে আহূতি দেওয়া হয় তা অগ্নির মাধ্যমেই অন্য দেবতারা পেয়ে থাকেন। বৈদিক ঋষিরা অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, আগুন অর্থাত্ তাপ হচ্ছে জীবনের উত্স এবং জীবের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান উপাদান এবং সে কারণেই অগ্নিকে দেবতা হিসেবে পূজার প্রচলন শুরু হয়। অগ্নি একাধারে যজ্ঞ, গৃহ ও অন্নের অধিপতি। উপনিষদের ব্রহ্মার মতো অগ্নি সর্বভূতে বিরাজমান। আধুনিক যুগেও খাবার তৈরি, তাপ ও আলো দেওয়ার পাশাপাশি আগুন কখনো মোমবাতি বা মশালে প্রতিবাদের প্রতীক, আবার কখনো ফানুস বা আতশবাজিতে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। নৃবিজ্ঞানীদের ধারণা, বিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের আজকের মানুষে পরিণত হওয়ায় আগুনের ভূমিকা অপরিসীম।
একসময় আমাদের এই উপমহাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সতীদাহ বা সহমরণ প্রথা চালু ছিল। স্বামী মরে গেলে স্ত্রীকেও চিতায় উঠতে হতো। রামমোহন-বিদ্যাসাগর প্রমুখ মহামহিম ব্যক্তির কল্যাণে সমাজ থেকে সতীদাহ বা সহমরণ প্রথা উঠে গেছে। তবে যুগের পরিবর্তনে ‘পতিহারা সতী নারী’ নয়, উচ্ছেদের নামে আগুন দেওয়া হয় গরিবের আবাস বস্তিতে। সতীদাহ হতো প্রকাশ্যে। আর বস্তি দাহ করা হয় গোপনে। তবে শুধু বস্তিতেই আগুন দেওয়া হয় না, বিভিন্নজনের বাড়িঘরে, এমনকি অফিসেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুন এখন স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার। ক্ষোভ প্রকাশ, ষড়যন্ত্র নথিপত্র গায়েব করার জন্য আগুন ধরিয়ে দেওয়া একটি লাগসই প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে। তবে এখন আগুন বস্তি ছেড়ে বড় বড় অট্টালিকাকেও টার্গেট করেছে। আগুন যে সবসময় লাগানো হয়, তা নয়। অনেক সময় আগুন লেগেও যায়। বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পেছনে থাকে ‘শর্টসার্কিট’।
যদিও আগুন নিয়ে রসিকতা, আলোচনা, মত-মন্তব্য সবকিছুই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ আগুন বড়ই মারাত্মক। আগুন জ্বলে। জ্বালায়। আগুন লাগে। আবার লাগানোও হয়। কোনটা যে লাগে আর কোনটা যে লাগানো হয়—এই রহস্যঘেরা দেশে এটা বেশিরভাগ সময়ই জানা যায় না।
দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানা রকম আগুনের দেখা পাই। চুলার আগুন। চিতার আগুন। বনের আগুন, মনের আগুন, ক্ষোভের আগুন, লোভের আগুন, দেহের আগুন, চোখের আগুন। জ্ঞাত আগুন, অজ্ঞাত আগুন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আগুন। এই ‘শর্টসার্কিটের আগুন’ খুবই অভিনব ও রহস্যময়। আগুন লাগার পর যদি তার উত্স সম্পর্কে কোনোরকম কূল-কিনারা করা না যায়—তখনই বলা হয়, এটা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আগুন! আমাদের দেশে অনেক সময় শ্বশুরবাড়িতে মেয়েদের মেরে-পিটিয়ে হত্যা করে যেমন ‘আত্মহত্যা’ বলে চালানো হয়, আগুন লাগানোর বেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রে ‘শর্টসার্কিট’ হিসেবে চালানো হয়! বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আগুন সত্যিই অনেক ধন্বন্তরী। বহু ষড়যন্ত্রকারীর পিঠের চামড়া বাঁচাতে তা যুগে যুগে ভূমিকা পালন করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আগুনকে যে ভয় পায়, সে আগুনকে ব্যবহার করতে পারে না।’ কথাটা খুবই সত্যি। আমরা আগুনের যথাযথ ব্যবহার শিখিনি। শিখিনি আগুনের বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। তাই আগুনকে ভয় পাওয়া শুরু করেছি। পুরো ঢাকা শহরেই চলছে আগুন আতঙ্ক। মাত্র একমাসের ব্যবধানে বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় একশ লোকের প্রাণহানির ঘটনার পর এই আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বড় বড় বিল্ডিং, ঘরবাড়ি, মার্কেটের এই আগুন মানুষের মনের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছে। রাজধানীর নিমতলী এবং বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগার পর ফেসবুকে আমার এক বন্ধুর মন্তব্য—‘বস্তি থেকে বহুতল ভবন—সবখানেই আগুন। এই আগুন শোষকদের ঘরে কবে লাগবে?’ এক ভদ্রলোক তো ঢাকাইয়া ভাষায় এক গণমাধ্যমে বিশাল ক্ষোভ ঝেড়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হগলে মিল্লা আমরা পুরান ঢাকার কথা কই, নতুন ঢাকার কথা কইবো কেডায়। পুরান ঢাকায় বাড়ির ভিতরে গোডাউন, কেমিকেল-এর গোডাউন। একেকটা বাড়ি একেকটা বোমা... বাড়ির মালিকরা মানুষ না, সব টেকার কুমির, সব খাচ্চড়। চিকন চিকন গলি, গাড়ি যাওনের রাস্তা নাই। হাডনের জায়গা নাই। মাইনসে সংসার করে বউ পোলাপাইন লইয়া না, বোমা লইয়া... আগুন লাগলে সব পুইড়া মরে কারণ ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওনের রাস্তা নাই, পানি দেওনের পানি নাই। মাইনষে খালি মরে আর মরে। হগলে মিল্লা পুরান ঢাকা লইয়া কথা কইছেন, নতুন ঢাকা লইয়া কথা নাই। নতুন ঢাকায় বিল্ডিং আসমান ছুঁইতেছে। বিল্ডিং-এর তলা গুনতে গুনতে ঘাড়ে বিষ করে, চোক্ষে ঝাপসা লাগে। নয়া নয়া বিল্ডিং চকচক ঝকঝক করতাছে। বড় লোকের বিরাট কারবার। বছর দুই আগে একবার সরকার চাইছিল নতুন ঢাকার সব বাড়িত থেইক্কা সব দোহানপাট তুইল্যা দিবো, পারে নাই। পুরান ঢাহার মানুষ মরে পুইড়া, নতুন ঢাহায় মানুষ মরে লাফাইয়া পইড়া। মরার ধরনে খালি তফাত্। মোডের উপরে কথা হইলো মানুষ মরছে। আর হগলে ঢাকায় মরছে।’
আগুনের ব্যাপারে আমাদের আসলে আরও সাবধানী হওয়া উচিত। আগুন, যার একটাই গুণ—কেবল জ্বালাতেই জানে। এই অগ্নিক্ষুধা এতটাই একপাক্ষিক ঘটনা যে, জান-মালসহ কিছুই আর অবশিষ্ট রাখে না। আগুন আর লোভ বাড়তে দিলে সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে দুটোই। কাজেই আগুন যেন লাগে, তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সবকিছুই করতে হবে। আগুন নিয়ে খেলা বন্ধ করতে হবে এখনই। তা না হলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই একদিন পুড়ে-ছারখার হয়ে যাবে!
পুনশ্চ : ইন্টারভিউ বোর্ডে একজন চাকরিপ্রত্যাশীকে এক প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করলেন, ‘কল্পনা করো তো, তুমি একটা ২০ তলা বাড়ির ১৫ তলায় আছো। এমন সময় ভীষণ আগুন লেগে গেল। সবাই ছোটাছুটি শুরু করল। তুমি কী করবে?’
চাকরিপ্রার্থী : আমি কল্পনা করা বন্ধ করব!
ঢাকা শহরে বিল্ডিং-কোড না মানা হাজার হাজার বহুতল ভবনে যদি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা চলতেই থাকে তাহলে কী হবে? আপাতত কল্পনা বন্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো কিছু চিন্তা করা যাচ্ছে না!
n লেখক : রম্যরচয়িতা