মরুভূমির মধ্যে কৃত্রিম হিমবাহ

সারা বছর বৃষ্টিপাতের কোন দেখা মেলে না, তাপমাত্রাও থাকে শূন্য ডিগ্রির থেকে অনেক নিচে। পৃথিবীর একমাত্র এই জায়গাতেই এমনটি ঘটে। বলা হচ্ছে, ভারতের উত্তর অংশে অবস্থিত লাদাকের মরুভূমির কথা। এই মরুভূমিতে খোলা পায়ে সূর্যের নিচে থাকলে এক সাথে সানস্ট্রোক আর ফ্রস্টবাইটের মতো মৃত্যুঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রাকৃতিক কারণে হিমালয় আর কুনলুনের মাঝখানে অবস্থিত লাদাকের পর্বতময় এই শীতলতম মরুভূমিতে তীব্র পানি সংকটের কারণে কৃষকদের কৃষিকাজ করাটাই যেন দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আর এই পরিস্থিতি আরো বেশি জটিল আকার ধারণ করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। তবে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নতুন আশার দুয়ার উন্মোচন করার চেষ্টা করছেন ভারতের এক বিজ্ঞানী। মরুভূমির মধ্যে পানির উত্স তৈরি করতে কৃত্রিমভাবে সেখানে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে হিমবাহ।

সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে শীতকালে তুষার পড়ার হার গ্রীষ্মকালে গলনের হারের চেয়ে বেশি হলে পাহাড়ের উপরে তুষার জমতে থাকে। জমে জমে এক সময় শক্ত বরফে পরিণত হয়। এই বরফজমা এলাটিকে বলা হয় বরফক্ষেত্র। আর এই বরফক্ষেত্র নিজের ওজনের ভারে এবং মধ্যাকর্ষণের  টানে ধীরগতিতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলে তখন তাকে হিমবাহ বলে। বিজ্ঞানের এই সূত্রটিকে কাজে লাগিয়ে ২০১৪ সালে লাদাকের মরুভূমিতে কৃত্রিম হিমবাহ তৈরির উদ্যোগ নেন স্থানীয় মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার সোনম ওয়াঙচুক। শুষ্কতার কারণে এই মরুভূমিতে সারা বছরই পানির জন্য হাহাকার থাকে কৃষকদের। এপ্রিল-মে মাসে যখন সূর্যের প্রচণ্ড তাপে এখনকার তুষার গলতে শুরু করে তখন আরো শুষ্ক হয়ে ওঠে সেখানকার মাটি।

এই পরিস্থিতি থেকে কৃষকদের মুক্তি দিতে সোনম ওয়াঙচুক শীতকালে তুষার সংগ্রহ করে এক জায়গায় জমাতে শুরু করেন। গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড উত্তাপে তুষার গলে নিঃশেষ হতে শুরু করলে এই জমানো বরফকে কাজে লাগিয়ে পানির উত্স তৈরি করার চেষ্টা করেন তিনি। কোন আকৃতির এই বরফ স্তুপে জমা করা হয় তুষার। কোন আকৃতির স্তুপ তৈরির জন্যও কোন প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হয় না ওয়াঙচুককে। এক্ষেত্রেও তিনি কাজে লাগান পদার্থবিদ্যার জ্ঞান। আর কৃষকদের পানি সরবরাহের জন্য প্রথমে তিনি মাটির নিচে একটি নল বসান। এরপর সেই নল দিয়ে পানির প্রবাহ তৈরি করেন। সেই নলের মাধমেই বরফ গলা পানি চলে যায় শুষ্ক ভূমিতে। এক একটি নল ৬০ মিটার পর্যন্ত দূরত্বে কৃষকদের পানির যোগান দিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সব সময় খেয়াল রাখতে হয় যেখানে পানির যোগান দিতে হবে সেটি যেন পানির উত্স থেকে নিচে অবস্থিত হয়। ঢালু হলেই কেবল পানি সাধারণ ধর্ম অনুযায়ী উপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হতে পারে।

ইত্তেফাক/নূহু