সাভার পৌর এলাকায় যত্রতত্র বহুতল ভবন নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। অধিকাংশ ভবন নির্মাণে সঠিক কোনো প্ল্যান মানা হচ্ছে না। পৌর কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করা হলেও এ ব্যাপারে তেমন কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না। পৌর কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাবে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে তোলা হচ্ছে এসব ভবন— এমনটাই অভিযোগ সচেতন মহলের। অপরিকল্পিত নগরায়ণে সাভার উপ-শহর ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। যেকোনো সময় ভবন ধসে পড়ে বা আগুন লেগে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। শুধু পৌরসভা এলাকাই নয়, পুরো সাভার উপজেলাই একটি অব্যবস্থাপনার নগরীতে পরিণত হয়েছে।
শুধু আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন নয়, শিল্প ও কলকারখানা নির্মাণের ক্ষেত্রেও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কারখানাগুলোতে নামমাত্র অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও আবাসিক বহুতল ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার লেশমাত্র নেই। ইতোমধ্যেই সাভার ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি ভবনকে চিহ্নিত করে ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়েছে।
সাভারে বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না ইমারত নির্মাণ আইন। আবাসিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণের নিয়ম থাকলেও সাভার উপ-শহরে তা অনেকটাই উপেক্ষিত। একটি ভবন থেকে অপর ভবনের দূরত্ব এতটাই কম যে, এক ভবনের বাসিন্দারা অপর ভবনের বাসিন্দাদের ছুঁতে পারে। আর এসব অব্যবস্থাপনা তদারকির দায়িত্বে যারা আছেন তারাও তেমন সক্রিয় নন। ফলে কখনো কোনো দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
২০১২ সালে আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১৩ জন শ্রমিক মারা যান ও তিন শতাধিক শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। কারখানাটিতে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। ২০১৩ সালে ধসে পড়া রানা প্লাজাও নকশা উপেক্ষা করে নির্মিত হয়েছিল, ৬ তলার পরিবর্তে করা হয়েছিল ৯ তলা। এছাড়া এতে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, পিলারের ভারবহন ক্ষমতা যথোপযুক্ত না থাকা, কারখানাগুলোতে জেনারেটর ও বয়লারসহ বিপুল পরিমাণে যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং একসঙ্গে সব জেনারেটর চালানোর ফলে সৃষ্ট কম্পনকে ভবন ধসের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
কয়েকদিন আগেও সাভারের তালবাগ মহল্লায় একটি ৬ তলা ভবন পার্শ্ববর্তী ভবনের ওপর হেলে পড়ে। এ ঘটনায় ভবনের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন পৌর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ভবনটি বুয়েট কর্তৃক পরীক্ষা না করা পর্যন্ত সেখানে বসবাস না করার জন্য বাড়ির মালিককে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
আবাসিক এলাকায় আইন অনুযায়ী মিল-কারখানা স্থাপন নিষিদ্ধ থাকলেও একের পর এক কারখানা গড়ে উঠছে। এমনকি পৌর এলাকায় ইটভাটা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে গার্মেন্টস কারখানাও গড়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রাস্তার জায়গা না রেখেই ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে অধিকাংশ এলাকার রাস্তাগুলো সরুভাবে তৈরি করা হচ্ছে। ফলে কোনো কোনো মহল্লায় গাড়ি নিয়ে ঢোকা তো দূরের কথা, রিকশা নিয়েও যাতায়াত করা যায় না। এসব এলাকার অসুস্থ রোগীকে হাসাপাতালে নিতে চরম সমস্যায় পড়তে হয়।
সাভার পৌরসভাধীন এলাকায় নতুন কোনো ঘর বা ইমারত নির্মাণ করতে গেলে সাভার পৌরসভার অনুমতি ও অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। পৌর কর্তৃপক্ষ নকশা অনুমোদন করলে তবেই ভবন নির্মাণ করা যাবে; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পৌরসভা থেকে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে না। কাগজে কলমে যে অনুমোদন নেওয়া হয়, বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। আবার অনেকে পৌরসভার অনুমোদন না নিয়েই রাস্তার জন্য জায়গা বা চতুর্দিকে জায়গা না রেখেই বহুতল ভবনের ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি কিংবা মার্কেট নির্মাণ করছেন। ফলে সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।
সাভার পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সাভার পৌরসভার কোনো মাস্টারপ্ল্যান নেই। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে পত্র দেওয়া হয়েছে।