ছিল ‘বাংলাদেশ বেতার’, রেডিও পাকিস্তানের ধাঁচে রাতারাতি তা হয়ে গেল ‘রেডিও বাংলাদেশ’। ঘটনাটি ঘটল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর। আমি তখন বাংলাদেশ বেতারের প্রকাশনা দপ্তরের সম্পাদক। মাথার ওপর বিনা মেঘে বজ্রপাত হলে যে অবস্থা হয়, ঠিক সেই রকম একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির শিকার হলাম আমরা। বেতার-কর্মীদের ওপর নেমে এল নানারকম নির্যাতন। বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের কাজ হলো জাতীয় পর্যায়ের জরুরি বিষয়গুলো সংরক্ষণ করা। রুটিন ওয়ার্ক মানে দৈনন্দিন কাজ হিসেবেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংরক্ষণের জন্য ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের স্টুডিওতে টেপ ট্রান্সফার করা হচ্ছিল। ট্রান্সফারের কাজ করছিলেন নির্মলচন্দ্র মণ্ডল। হঠাত্ খুনিরা স্টুডিওতে ঢুকে পড়ল এবং দেখল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো হচ্ছে। আর যায় কোথায়? গরুর মতো পেটাতে শুরু করল সবাইকে। পিটিয়ে ধরে নিয়ে গেল আশরাফুল আলম ও নির্মলচন্দ্র মণ্ডলকে।
ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের পরিচালক শহীদুল ইসলাম তখন দপ্তরে ছিল না। কে বা কারা বলেছে—আশরাফুল আলম বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো বাইরে পাচার করে নিয়ে যাবার জন্য এক টেপ থেকে আরেক টেপে ট্রান্সফারের নির্দেশ দিয়েছে। শহীদ আর আমি তখন বেতারের দায়িত্বে নিয়োজিত সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের সংশ্লিষ্টজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকলাম যাতে আশরাফুলকে ছাড়িয়ে আনা যায়। আশরাফ শুধু সহকর্মী নয়, সে আমাদের দু’জনেরই ব্যক্তিগত বন্ধু। আমরা সরকারি কর্মকর্তা; আমাদের একটা পরিচয় আছে—আমরা মুক্তিযোদ্ধা, আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু এরকম শারীরিক নির্যাতন করার অধিকার তারা কোথায় পেল? ঠিক এভাবেই বরং আরো তীব্র ভাষায় একজন খুনির কাছে এই ঘটনার প্রতিবাদ করল শহীদ।
তারপর ৩ অক্টোবর গভীর রাতে আমাকে আর শহীদুল ইসলামকে আমাদের সরকারি বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেল মেজর শাহরিয়ার ও তার দল। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তারা কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়া মানেই একরকম নির্ঘাত মৃত্যু। আমাদের প্রথমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। ‘কী অপরাধ আমাদের?’—মেজরের কাছে জানতে চাইলে তার এককথা—পরে জানানো হবে। অনেক অনুনয়-বিনয় করে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের কাছে জানতে পারলাম—আমরা নাকি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মতো ‘বঙ্গবন্ধু বেতার কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি!
সে রাতেই আমাদের দু’জনকে আলাদা করে ফেলা হলো। এবং চলল ইন্টারোগেশন—প্রশ্নের পর প্রশ্ন। তখন কী উত্তর দিয়েছিলাম, আজ আর হুবহু বলতে পারব না। তবে যে কথাটি এখনো মনে আছে, তা হলো—আমি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। তাঁর মৃত্যুতে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। ওদের কে একজন বলল, মেজর...অমুক বলেছেন—এই ফজল-এ-খোদা হলো ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানের লেখক এবং ২ নম্বর সেক্টরের মেজর হায়দারের একজন সহযোদ্ধা।
আমি ছাড়া পেলাম। শহীদও ছাড়া পেল।
আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেন বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে যাঁরা আসেন, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরটি কোথায়? আমি উত্তরে বলি—এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশই তো বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর।
—লেখক: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
ইত্তেফাক/নূহু