বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনব্যাপী রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সাধনায় পূর্ব বাংলার বাঙালির হাজার বছরের স্বাধীনতার স্বপ্নকে যেভাবে বছরের পর বছর জেল জুলুম নির্যাতন ভোগ করে এবং ফাঁসির মঞ্চ থেকে বেঁচে গিয়ে সম্ভব করে তুলেছিলেন পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। এই নজিরবিহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি সামিল হয়েছিলেন গোটা মানব জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের ধারায়।
তার অকুতোভয় এবং একাগ্রনিষ্ঠ নেতৃত্বের অসীম মহিমাতেই তিনি উন্নীত হয়েছিলেন তৃতীয় বিশ্বের কিংবদন্তি প্রতিম শীর্ষ নেতাদের সারিতে। আমাদের এ কথায় কিছুমাত্র অতিরঞ্জন যে নেই তার প্রমাণ কিউবার মহান বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বঙ্গবন্ধু-মূল্যায়ন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ বঙ্গবন্ধুকে ক্যাস্ট্রোর মতো নেতা হিমালয়ের সঙ্গে তুলনায় তার উচ্চতা এবং নেতৃত্বের অসামান্যতা উপলব্ধি করা যায়।
ক্যাস্ট্রোর মতো মহামহিম রাষ্ট্রনায়ক যেমন বঙ্গবন্ধুকে তৃতীয় বিশ্বের এক মহান নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তেমনি গোটা উপমহাদেশে বাংলাভাষী মানুষও বিবিসির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচনে তাকেই শীর্ষ আসন দিয়েছে। প্রকৃত গণমানুষের নেতা ক্যাস্ট্রো এবং বিপুল সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত যে দিন শেষে একই হয়ে থাকে তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন।
ক্যাস্ট্রো যেমন তাকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন; তেমনি সাধারণ মানুষও তাদের ভোটে বঙ্গবন্ধুকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতার আসনে বসিয়েছেন। একেই বলে ইতিহাসবোধ। ইতিহাসের নায়কদের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা এবং সাধারণ মানুষের ইতিহাস চেতনা একই উেস এসে মিলিত হলে তাকেই বলা চলে প্রকৃত ইতিহাসবোধ। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে মহান এবং সাধারণের ইতিহাসবোধ একই উেস এসে মিলে গেছে।
কিন্তু হায়! বাংলা ও বাঙালির এই দেশে দেশদ্রোহী আছে, ভিন দেশের ভাড়াটে আছে, কবি আবদুল হাকিমের ভাষায়— ‘জারজ সন্তানেরা’ আছে। তারা বিবেক বিবেচনাহীন অমানুষ; মনুষ্য নামের কীটানু কীট। নিষ্ঠুর পাশবিকতায় দেশ মাতৃকার মুক্তিদাতাকে তারা নিষ্ঠুর পাশবিকতায় সপরিবারে হত্যা করে গোটা বাঙালির ইতিহাসকে করেছে কলঙ্কিত। তাদের নিজ মাতৃচরিত্রকেও রাখতে পারেনি সন্দেহমুক্ত। ধিক তাদের! তাদের ঘৃণা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। বাঙালির কলঙ্কময় দিনে কুলাঙ্গার তারা। কুলাঙ্গারেরা নিপাত যাক।
বিদেশি ভাড়াটে চর এবং কুলাঙ্গারেরা ইতিহাসের ধারা বোঝে না, তাই তারা আবর্জনার স্তূপে নিমজ্জিত হয়। তারাও ইতিহাসের আবর্জনার স্তূপেই নিমজ্জিত হচ্ছে। কিন্তু মানবমুক্তির নায়কদের দৈহিক অবয়বকে নিশ্চিহ্ন করা যেতে পারে কিন্তু তার নীতি, আদর্শ ও দর্শনকে কখনোই পরাজিত করা যায় না, নিঃশ্বেষ করা যায় না। যুগ থেকে যুগান্তরে তা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধুর নাম, তার জীবনদর্শন এবং আদর্শ অবিনাশী। একে হত্যা করা যায় না। এ চির উজ্জ্বল, চির উজ্জীবিত। জয়তু বঙ্গবন্ধু।
লেখক:ফোকলোর বিশেষজ্ঞ ও মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি
ইত্তেফাক/নূহু