আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ২৫ মার্চ হানাদার বাহিনী আক্রমণ চালালে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এখন কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন যে, একজনের নেতৃত্বে নাকি দেশ স্বাধীন হয়নি। তারা কী ইয়াহিয়া খানের বক্তব্যে শুনেননি? ইয়াহিয়া খান তার ভাষণে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই দায়ী করেছেন। এ কারণে একমাত্র বঙ্গবন্ধুকেই গ্রেফতার করা হয়, ফাঁসির রায় ঘোষণা করে তাকে হত্যা করার চেষ্টাও করা হয়। অন্য কাউকে তো ইয়াহিয়া দোষী বা গ্রেফতার করে ফাঁসির রায় দেননি। যারা বলেন একক নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়নি তাদের ইয়াহিয়ার বক্তব্য শোনার পরামর্শ দেন তিনি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাত্ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বুধবার বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘কারো একক নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি’- আদালতের এমন পর্যবেক্ষণের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শুধু নেতৃত্বই দেননি, দেশকে স্বাধীন করার জন্য আওয়ামী লীগ গঠন করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছেন। দলকে সুসংগঠিত করতে মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়ে সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। গোটা বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তার প্রতিটি নির্দেশ বাঙালি জাতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও তার বক্তব্যে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য একমাত্র জাতির পিতাকেই দায়ী করে গেছেন, অন্য কাউকে নয়।
তিনি বলেন, কেউ কেউ বলতে চেষ্টা করেন একজনের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়নি। কিন্তু একজনকে তো নেতৃত্ব দিতে হয়। একজনের তো নেতৃত্ব থাকে। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ গঠন করতে সারাদেশ চারণের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। অসহযোগ ঘোষণা দিয়েছেন। মুক্তিকামী মানুষকে সাহস দিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল। ঠিক তখনই নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। একটি মহল ও গোষ্ঠী দেশকে আবারও পিছিয়ে দিতে ষড়যন্ত্র করছে। অনেকেই জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কোন দল নির্বাচনে না আসলে আমাদের কি করার আছে? নির্বাচনে আসা বা না আসা দলগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কোন দলের নেতা যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে, তার খেসারত তার দলকেই দিতে হবে। দেশ ও জনগণ কেন দেবে?
প্রধানমন্ত্রী দেশের কিছু সুশীল সমাজের প্রতিনিধির কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেন, দেশের অনেক ব্যক্তি আছেন যারা নিজেদের অনেক জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিজীবী ভাবেন তারা কেন সব সময় অপশক্তিদের উৎসাহিত করেন? এদেশের মানুষের কী একটু ভাল ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই? দেশের মানুষের ভাগ্যে নিয়ে আর যাতে কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে, উন্নত, সুন্দর ও সম্ভাবনায় দেশ গঠনের চলমান কার্যক্রমকে কেউ যাতে আর ব্যাহত করতে না পারে- এ ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানকে আবারো দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যায় খুনি মোশতাকের দোসর ছিলেন জিয়াউর রহমান। এ কারণেই খুনি মোশতাক জিয়াকে সেনা প্রধান বানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়াউর রহমান যদি জড়িতই না হতেন, তিনি যদি দোষীই না হতেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িতই না থাকতেন তবে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যুক্তরাজ্যের এমপিদের নিয়ে গঠিত গণ কমিশনকে বাংলাদেশে আসতে দিতেন, তদন্ত করতে দিতেন। জড়িত না থাকলে কেন তিনি ওই তদন্ত কমিশনকে বাংলাদেশে আসতে দিলেন না? শুধু জিয়াউর রহমানই নয়, তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও বঙ্গবন্ধুর যে খুনির বিচার চলছে, তাকে দূতাবাসে চাকরি ও পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। যারা খুনিদের পুরস্কৃত করে তারা খুনি ছাড়া আর কী? দেশের মানুষের ভাগ্যে নিয়ে আর কেউ যাতে ছিনিনিনি খেলতে না পারে সেজন্য দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা দখলকারীরা দীর্ঘ ২১টি বছর আত্মস্বীকৃতি খুনিদের ক্ষমতার সঙ্গী বানিয়েছিল। এখন একটি হত্যা হলেই বিচারের জন্য সবাই সোচ্চার হয়ে উঠেন। কিন্তু ২১টি বছর আমার বিচার চাওয়ার অধিকারই কেড়ে নেয়া হয়েছিল। যারা আমার বাবা-মা, ভাই, আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করেছিল, সেসব হত্যাকারীদের যারা পুরস্কৃত করেছিল, ক্ষমতার অংশীদার করেছিল- তাদের প্রতি দেশবাসীর ঘৃণা কী থাকবে না? এরা কেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেবে? তাদের ক্ষমতায় আনার জন্য কেন বার বার চক্রান্ত করা হবে? ২১টি বছর তো আমি বিচার চাইতে পারিনি।
আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ একটি শোক সইতে পারে না। কিন্তু আমরা দু’বোন সব হারানোর কী দুঃষহ ব্যাথা, বেদনা ও যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি তা যারা স্বজন হারিয়েছেন তারাই বুঝতে পারবেন। আমার পিতা বঙ্গবন্ধু সারাটা জীবন শুধু দিয়েই গেছেন, কোন কিছু নিয়ে যাননি। দেশের মানুষের কাছে কোন দেনা রেখে যাননি, শুধু দিয়েই গেছেন। বঙ্গবন্ধু ও আমার মা দেশের মানুষের জন্য সারাজীবন শুধু ত্যাগই করে গেছেন। মৃত্যুর পর কাফনের কাপড়ও পর্যন্ত দেয়া হয়নি। রিলিফের কাপড় দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দাফন করা হয়েছে।
কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে তিনি বলেন, কী অপরাধ ছিল আমার মায়ের? কী অপরাধ ছিল শিশু রাসেলের? আসলে জাতির দুর্ভাগ্য, যারা দেশের কল্যাণে কাজ করেন, তাদেরই জীবনে চরম খেসারত দিতে হয়। ৭৫’এর পর থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মনে হতো যেন মুক্তিযুদ্ধ করাটাই যেন একটা অপরাধ। স্বাধীনতা আনাটাই যেন একটি অপরাধ। বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে গড়ে তোলার একটা প্রচেষ্টা ওই সময়ে দেখেছি।
বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ ও আদর্শে দিক্ষিত হয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে ব্রতী হতে দলের প্রতিটি নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৮ বছরে দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার একটাই লক্ষ্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন নিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণ করা। প্রতি মুহূর্তে আমি একটাই চিন্তা করি, এদেশের মানুষের স্বাধীনতা ও মুখে হাসি ফোটাতে আমার বাবা, মা, ভাইসহ সবাই জীবন দিয়ে গেছেন। তাদের স্বপ্ন পূরণ করে যদি দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারি, উন্নত-সুন্দর জীবন দিতে পারি, তখন আমার মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে বলতে পারবো- পিতা, তোমার স্বপ্ন কিছুটা হলেও পূরণ করতে পেরেছি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলবোই।
আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সাংবাদিক-কলামিস্ট আবেদ খান প্রমুখ।
ইত্তেফাক/ইউবি