দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার পাদপীঠ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরিয়া অচলাবস্থা বিরাজ করিতেছে। সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন-সংগ্রাম চালাইয়া যাইতেছে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে। কয়েকদিন আগে তাহারা বরিশাল-পটুয়াখালী সড়ক অবরোধ করে এবং গত শুক্রবার তাহারা পালন করে গণঅনশন কর্মসূচি। এমনকি ইহার আগে তাহারা নিজেদের রক্ত দিয়া উপাচার্যবিরোধী নানা শ্লোগান বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে লিখিয়া প্রতিবাদ জানায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করিয়া শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হইলেও আন্দোলনকারীরা এখনো ক্যাম্পাস ছাড়ে নাই। গতকাল শনিবারের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের সহিত বৈঠকে বসিলেও তাহা ফলপ্রসূ হয় নাই। আনুষ্ঠানিকভাবে ভিসির পদত্যাগ ব্যতীত আন্দোলনকারীরা ক্ষান্ত হইবে না বলিয়া জানা গিয়াছে।
এখানে প্রশ্ন হইল, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাত্ করিয়া শিক্ষার্থীরা ভিসিবিরোধী আন্দোলনে নামিলেন কেন? জানা যায়, গত ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপনকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চা, চক্র ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালন করেন। কিন্তু অভিযোগ রহিয়াছে যে, এই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হয় নাই। এই লইয়া শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করিলে উপাচার্য তাহাদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলিয়া গালি দেন, যাহার ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ইহার পরই বিক্ষুব্ধ হইয়া ওঠে শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ প্রদর্শনের ইহাই মূল কারণ নহে। ইহার আগে শিক্ষার্থীরা ২২ দফার ভিত্তিতে আন্দোলন গড়িয়া তোলে। তাহাদের দাবিগুলির অন্যতম ছিল বিভিন্ন ফি কমানো, কিন্তু উল্টা ফি আরো বাড়ানো হইয়াছে। অন্যান্য দাবি পূরণে আশ্বাস দেওয়া হইলেও তাহা পূরণ করা হয় নাই। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ চলমান আন্দোলনেও লক্ষ্য করা যাইতেছে। তাহা ছাড়া উপাচার্যের গত চার বত্সর ধরিয়া নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং ব্যর্থতার কথাও তুলিয়া ধরিতেছে তাহারা। একজন ভিসি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক। শিক্ষার্থীরা তাহার সন্তানতুল্য। আমরা মনে করি, অশালীন ও বিবেকহীন মন্তব্যের জন্য ভিসির অবশ্যই দুঃখ প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেসব দাবি তুলিতেছে তাহা মীমাংসাও জরুরি।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়টি তুলনামূলকভাবে নূতন। ২০১১ সালে ইহা প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় ভিসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করিতেছেন। কিন্তু গত আট বত্সরেও বিশ্ববিদ্যালয়টির কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয় নাই। নূতন নূতন বিভাগ খোলা হইতেছে, ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা বাড়িতেছে। কিন্তু তাহাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িতেছে না। একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরিসহ পরিবেশ উন্নয়নে বৃক্ষরোপণের ব্যবস্থা নাই। শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নহে, শিক্ষকদের জন্যও আবাসন, ব্যক্তিগত কক্ষসহ পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয় নাই। এই বিক্ষোভের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহিতার অভাব, স্বৈরাচারী মনোভাব ও ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি বহুলাংশে দায়ী। অতএব, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অস্থিরতা নিরসন করিয়া সেইখানে দ্রুত লেখাপড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরাইয়া আনা অত্যাবশ্যক।