মো. রাশেদ আহমেদ
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। প্রাচীনতম এ শহরটি এদেশের ইতিহাস সংগ্রামের সোনালী অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। কিন্তু বর্তমানে যতই দিন যাচ্ছে ততই ঢাকা শহরকে নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলছে। কারণ দিন দিন বসবাসের অযোগ্য শহরসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা গ্রাস করছে। ঢাকা শহরে যতগুলো সমস্যা আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, যানজট, অতিরিক্ত শিল্প-কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অধিক বিপণি বিতান, রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা, বায়ু দূষণ ইত্যাদি। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ নীতি ছাড়া অন্য উপায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
জীবিকার তাগিদে বা ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রতিদিন ঢাকায় আসছে হাজারো লোক। এ শহরে প্রতি বর্গমাইল এলাকায় বাস করে এক লাখ ১৫ হাজার লোক। অর্থাত্ মোট জনসংখ্যার এক কোটি ৫০ লাখেরও বেশি লোক বাস করে এই আজব শহরে। যা জনসংখ্যা বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম এবং সমগ্র বিশ্বে নবম বৃহত্তম জনবহুল শহর।
অপরদিকে ঢাকা শহরে বসবাসরত লোকদের যানজটের কারণে স্বাভাবিক জীবনকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। যা দিন দিন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দশ মিনিটের হেঁটে যাওয়ার পথ যানজটের কারণে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যা ঢাকাবাসীর জন্য নিত্যদিনের সঙ্গী। বিশ্বে যানজট নগরী ঢাকার অবস্থান প্রথম। যার ফলে প্রতিবছর ৩৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সেইসঙ্গে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে শুধুমাত্র যানজটের কারণে। যা খুবই উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিককালে এ তথ্য প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। এছাড়াও ট্রাফিক অদক্ষতা ও সময়ের অপচয়ের দিক থেকে ঢাকার অবস্থান প্রথম। বর্তমানে ঢাকা শহরে বায়ু দূষণ বেড়েই চলছে। কারণ যানবাহন বাড়ছে ত্বরিতগতিতে। এছাড়াও শিল্প-কারখানার ধোঁয়া তো আছেই। যার ফলস্বরূপ প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট, হাঁপানিসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। নির্মল বাতাসে শ্বাস নিব এই সুযোগ নেই বললেই চলে। বায়ু দূষণের দিক থেকে বিশ্বে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়।
বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা ও বেহাল রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখলে মনে হয় না যে ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা হওয়ার কারণে বিদ্যমান সমস্যা বেড়েই চলছে। কোনো সরকারি ও বেসরকারি চাকরির জন্য ছুটে আসতে হয় ব্যস্ত নগরীতে। যার ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবন শেষে ঢাকাতে চলে আসতে একরকম বাধ্য হয়। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সমস্যার পারদকে আরো বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। চকবাজারের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে বনানীতে মুহূর্তে ঝরে গেল ১৭টির অধিক প্রাণ। ঢাকা শহরে ৯০% -এর অধিক ভবনে নেই কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। যার ফলে হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলছে।
আজ ঢাকা শহরে হাজারো সমস্যা বিদ্যমান। যে সমস্যাগুলো একদিনে সৃষ্টি হয়নি আবার একদিনে সমাধান করাও সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন। প্রথমত, ঢাকার বাইরে শিল্প-কারখানার জন্য বিশেষ এলাকা গড়ে তুলতে হবে যা Special Industries Zone হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। দ্বিতীয়ত, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বিভাগীয় শহরে হস্তান্তর করতে হবে। তৃতীয়ত, ঢাকার বাইরে বিভাগীয় ও জেলাগুলোতে সমান কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। চতুর্থ, ঢাকার বাইরে সকল বিভাগ ও জেলা শহরকেও সমান সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চম, বিষাক্ত গ্যাস কার্বন-ডাই অক্সাইড (CO2) থেকে রক্ষা পেতে ও অক্সিজেনের অভাব দূর করার জন্য সড়কে গাছ লাগার কোনো বিকল্প নেই। ষষ্ঠ, পানি সংকট দূরীকরণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে। সেইসঙ্গে পানির পুনর্ব্যবহারের কথা ভাবতে হবে। সপ্তম, অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে রাজউককে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। অষ্টম, অগ্নিকাণ্ড থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, সেফটি কেস, বিকল্প সিঁড়িসহ আরো প্রয়োজনীয় যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়াও যানজট থেকে মুক্তি নিরসনে উপরোক্ত সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়ে গেলে অনেকাংশে তা কমে যাবে। সেইসঙ্গে জনসংখ্যার চাপও কমবে বলে আমি দৃঢ় বিশ্বাস করি। সুতরাং ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হলে ও আগামীদিনের জন্য বসবাসের বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া