মাছের আঁশের কিছু আশ্চর্য ব্যবহার

নূশরাত বিথী

মাছের দেহের বাইরের অংশ সাধারণত আঁশ দিয়ে আচ্ছাদিত থাকে।  মাছের আঁশ বলতে আমরা সাধারণত মাছের উচ্ছিষ্ট অংশ বুঝে থাকি যা আমরা সচরাচর ফেলে দেই। কিন্তু এই আঁশের নানাবিধ ব্যবহার সম্পর্কে আমরা অনেকেই অজ্ঞাত। মাছের আঁশের কিছু আশ্চর্যকর ব্যবহার নিয়েই মূলত আজকের এই লেখা।

শক্তি উত্পাদন: মাছের আঁশের একটি গাঠনিক উপাদান হলো কোলাজেন  ফাইবার, এর উপর যখন কোনো প্রকার বাহ্যিক চাপ বা শক্তি প্রয়োগ করা হয় তখন এর থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ উত্পন্ন হয়। চীন ও জাপানে এই আঁশ ব্যবহার করে  এক ধরনের ন্যানোজেনারেটর তৈরি করা হয় যেগুলো দ্বারা রিচার্জেবল ব্যাটারিতে চার্জ দেয়া যায়। তাছাড়া ঘরোয়া বিদ্যুত্ উত্পাদনেও ব্যবহূত হয়ে থাকে এই বিশেষ ধরনের ন্যানোজেনারেটর।

ফার্মাসিউটিক্যালস: মাছের আঁশে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অ্যামাইনো এসিড যার কারণে মাছের আঁশের পাউডার বিভিন্ন দেশে স্যুপের সঙ্গে পুষ্টি প্রদায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়। তাছাড়া কোলাজেন সমৃদ্ধ হওয়াতে কৃত্রিম কর্ণিয়া ও কৃত্রিম হাড় তৈরিতেও ব্যবহূত হয় মাছের আঁশ। ডিজেনারেটিভ জয়েন্ট ডিসঅর্ডার রোগের প্রতিকারক হিসেবেও মাছের আঁশ ব্যবহার করা হয়। বিশেষ কিছু মাছের আঁশ (যেমন: তেলাপিয়া) মানুষের পুড়ে যাওয়া অংশে চামড়া প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য গবেষণা চলমান রয়েছে। এছাড়া মাছের আঁশ চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে ক্যাপসুলের মোড়ক তৈরির জন্য।

কসমেটিক্স বা প্রসাধনী: মহিলাদের সাধের প্রসাধনী লিপস্টিক ও নেইল পলিশের একটি অত্যাবশ্যক উপাদান হলো মাছের আঁশ থেকে আহরিত গুয়ানিন যৌগ। এই গুয়ানিন ব্যবহারের ফলে এই ধরনের প্রসাধনীর উজ্জ্বল ভাব ও স্থায়িত্ব বজায় থাকে। তাছাড়া মেকআপ ও ব্লাশ তৈরিতেও ব্যবহার হয় মাছের আঁশ থেকে আহরিত এই যৌগ। কিছু মাছের আঁশের সঙ্গে স্টোন ও ফেব্রিকস মিশিয়ে গয়না তৈরি করা হচ্ছে।

পরিবেশ দূষণ রোধ: পরিবেশ দূষণের মধ্যে বিশেষত পানি দূষণের জন্য দায়ী একটি কারণ হলো হেভি মেটাল পলিয়শন (Heavy metal pollution)। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে মত দিয়েছেন যে এই দূষণ রোধে মাছের আঁশ খুবই কার্যকরী। মাছের আঁশের রয়েছে জৈব শোষণ ক্ষমতা (bio-absorbance capacity) যার কারণে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন:কপার, সীসা ইত্যাদির দূষণ রোধ করতে মাছের আঁশ থেকে তৈরি পাউডার খুবই কার্যকরী, পরিবেশবান্ধব ও অর্থসাশ্রয়ী।

কৃত্রিম মুক্তা:মাছের আঁশের নির্যাস থেকে তৈরি হচ্ছে মুক্তা। তবে এখনো টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ সম্ভব হয়নি আমাদের দেশে। বাংলাদেশের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, কৃত্রিম মুক্তা উত্পাদন সম্ভব হলে বছরে ১৫০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া ২০ থেকে ৩০ লাখ লোকের এ শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ হতে পারে। হেরিং ফিশ, রিবন ফিশ ইত্যাদি মাছের আঁশ থেকে বেশি নির্যাস পাওয়া যায়। এসব মাছ  ছাড়াও অন্যান্য আঁশযুক্ত রূপালী মাছের আঁশ হতেও মুক্তার নির্যাস প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু হেরিং ও রিবন ফিশের স্কেইল হতে যতটুকু নির্যাস পাওয়া যায় তা অন্যান্য মাছ হতে পাওয়া যায় না। রিবন ফিশ আমাদের বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রচুর পাওয়া যায়। যার কারণে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের কৃত্রিম মুক্তা চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও মাছের আঁশ থেকে আঠা এবং খেলনা সামগ্রী তৈরি করে কুটির শিল্পে লাভবান হওয়া সম্ভব। জমিতে সার হিসেবে মাছের আঁশ ব্যবহার করা হয়। হাঁস মুরগির খাবারে মাছের আঁশ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে দেওয়া যায়।  মাছের আঁশ যেখানে-সেখানে ফেলে দিলে দূষণ হতে পারে। কিন্তু সঠিকভাবে মাছের আঁশ প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে আমরা সাবলম্বী হতে পারি। আমাদের প্রতিনিয়ত ফেলে দেওয়া মাছের আঁশের এত রকমের ব্যবহার সত্যিই অবাক করা। আমাদের চোখে যা বর্জ্য তা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান

ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়