বীমা করা বহুতল ভবন হাতেগোনা

রেজাউল হক কৌশিক

ঢাকায় বড় ভবনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এসব ভবনের বীমা করা নেই। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনে (বিআইএ) আনুমানিক হিসাবে এ ধরনের বীমাহীন ভবনের সংখ্যা দশ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এরমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনসহ স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কোনো ভবন মালিক বা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ভবন তৈরির জন্য ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয়নি, এমন একটি ভবনেরও বীমা নেই। এমন কি বীমা কোম্পানিগুলোর বহুতল ভবনের ক্ষেত্রেও বীমা করা নেই। ফলে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে না। সাম্প্রতিক সময়ে বনানীতে এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের পর বীমার বিষয়টি সামনে চলে আসে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অগ্নিকাণ্ডের পর বীমা করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটির সংস্থা (আইডিআরএ)।

আইডিআরের সদস্য গকুল চাঁদ দাস ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান আইনে বীমা করার বিধান রয়েছে। তবে বাধ্যবাধকতা নেই। বিল্ডিংয়ের জন্য অগ্নি ও ভূমিকম্প এই ঝুঁকির জন্য বীমা করা যায়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আইডিআর নিজস্ব অফিসের জন্য বীমার প্রিমিয়াম বাবদ প্রতি মাসে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করছে। সাধারণ বীমার কাছে এ টাকা পরিশোধ করা হয়।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, প্রায় সব ভবনই বীমা শূন্য। অর্থাত্ হাতেগোনা কয়েকটি ভবনের বীমা থাকতে পারে। তিনি বলেন, ঋণ নেওয়ার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান বীমা করে। এরপর ভবন নির্মাণ শেষ হলে আর প্রিমিয়াম দেয় না। তিনি বলেন, এসব ভবন বীমার আওতায় আনা গেলে দুর্ঘটনা কমতো। কারণ বীমা কোম্পানি পলিসি নেওয়ার আগে সমস্ত বৈধ কাগজপত্র দেখে। এক্ষেত্রে ভবনের প্ল্যান, রাজউকের অনুমোদনপত্র, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পানি দেওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ সিস্টেম এবং বিল্ডিং মেনে তৈরি করা হয়েছে কিনা তার সবকিছু দেখে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে বীমা করলে কাগজপত্র জাল হওয়ার সুযোগ থাকে না। তিনি বলেন, প্রতিটি বহুতল ভবনের জন্য বীমা বাধ্যতামূলক করা উচিত। তারমতে, এটির জন্য সরকারের একটি নির্বাহী আদেশ যথেষ্ট। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স নেওয়ার সময় বীমা আছে কি না সে বিষয়টি চেক করা যেতে পারে।

জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থাপনা বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের বীমা নেই। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবন নির্মাণ শেষ হয়। ভবনটি শহরের আকাশচুম্বি ভবনগুলোর মধ্যে অন্যতম। রাজধানীর মতিঝিলের কেন্দ্রে ৩১ তলা এ ভবনটির উচ্চতা ১০১ মিটার বা ৩৩১ ফুট। বীমা করার জন্য বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলামের ভবনের বীমা না থাকার কথা স্বীকার করেন।

রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে করা এক জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী সাততলা বা তার চেয়ে উঁচু ভবন আছে ১৬ হাজার ৯৩০টি। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজার ২৪টি ভবন ফায়ার সার্ভিস থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। অর্থাত্ ১১ হাজার ৯০৬টি ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে পালন করা হয়নি।

অন্যদিকে রাজধানীতে বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। কিন্তু বহুতল ভবনের সংজ্ঞায়ও পার্থক্য রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের আইন অনুযায়ী ছয়তলার ওপর যে কোনো ভবনই বহুতল। আর রাজউকের আইন অনুযায়ী, ১০ তলা থেকে বহুতল ভবন। দুই আইনের এমন সাংঘর্ষিক অবস্থার কারণে ১০ তলার নিচের বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র চায় না রাজউক। ফলে এই ভবনগুলো অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই গড়ে উঠছে। দুই আইনের এই সাংঘর্ষিক অবস্থার অবসান দরকার বলে মত সংশ্লি­ষ্টদের।