৫৩ বছরের চলচ্চিত্র জীবন। এর মাঝে ১৯৬৫ আর ২০১৬ ও ২০১৭ এ তিন বছর কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের তথ্য পাওয়া যায় না। ৫০ বছরে ২৭৪ টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। তবে বিস্ময় অপেক্ষা করছে এরপরেই। চলচ্চিত্র জীবনের প্রথম ২০ বছরে ১৪১টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রতিবছর গড়ে ৭ এর অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৭০ সালে সর্বাধিক ছবিতে অভিনয় করেছিলেন নায়করাজ, ১৯টি। ভারতের হিন্দি, বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ঊর্দু চলচ্চিত্রকে রাজ্জাক বাংলাদেশের সিনেমা হল থেকে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) হটিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানে ও পরে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে রাজ্জাক হয়ে উঠেছিলেন একচ্ছত্র অধিপতি। প্রতিটি সিনেমা হলে শুধু নায়করাজের চলচ্চিত্র।
১৯৬৪ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে রাজ্জাক অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ১৪১টি। আর ১৯৮৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ১৩৩টি। তবে জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালী সময় কাটিয়েছেন ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত। প্রায় প্রতি বছরই পাঁচের অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। অভিনয় জীবনের শুরু থেকে পরবর্তী তিনটি দশক পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে একা হাতে টেনেছেন নায়করাজ রাজ্জাক। তার সারাজীবনের কাজে এর প্রমাণ আমরা বারবার পেয়েছি। তিনি বলতেন, ‘আমার প্রেম, আমার ভালবাসা, আমার সবকিছু অভিনয় আর চলচ্চিত্রকে ঘিরে। এছাড়া আমি আর কিছু জানি না, পারি না।’
এ প্রসঙ্গে এসময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা শাকিব খান বলেন, এখনকার প্রজন্ম এবং আগামী যত প্রজন্ম বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে আসবে তাদের কাছে নায়করাজ রাজ্জাক একটি প্রেরণা হয়ে বিরাজ করবেন।
সত্যিই তাই! দর্শকের কথা মাথায় রেখে বারবার নিজেকে ভেঙেছেন রাজ্জাক। ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনে নিজের অবসর, বিশ্রামের কথা ভাবেননি। আবার যখন নবীন কোনো নায়ক এসেছেন সবসময় তাকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দিয়ে নিজেকে পাশে রেখেছেন। যাতে সেই তরুণ নায়ক ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
এক সাক্ষাতকারে রাজ্জাক বলেছিলেন, “শুধু অ্যাকশান, রোমান্টিক নয় ত্রিরত্নের মতো কমেডি ছবিতেও অভিনয় করেছি। আমি চেয়েছি দর্শকদের আনন্দ দিতে। আজিজুর রহমানের অতিথি ছবিতে আমি স্যাক্রিফাইসিং চরিত্রে অভিনয় করেছি। এসময় আলমগীর নতুন অভিনেতা। তাকে তুলে ধরার জন্য শাবানার সঙ্গে রোমান্টিক চরিত্রে আমি আলমগীরকে মেনে নিয়েছি। একইভাবে নারায়ন ঘোষ মিতার আলোর মিছিল ছবিতে আমি ফারুককে রোমান্টিক চরিত্রে মেনে নিয়েছি। কারণ আমার উদ্দেশ্য ছিল নতুন নায়ক হলে আমার উপর চাপ কমবে। আমার কাছে খুবই ভালো লাগে যে তারা উভয়েই (আলমগীর, ফারুক) জনপ্রিয়তা লাভ করতে পেরেছে। চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ১৯৭৪ সালে নতুন পরিচালক মাসুদ পারভেজ পরিচালিত ‘মাসুদ রানা’ ছবিতে আমি অতিথি শিল্পী হিসেবে একটি গানের দৃশ্যে অভিনয় করেছি। এতে নায়ক হিসাবে অভিনয় করে সোহেল রানা। তার জীবনে সেটি ছিল প্রথম ছবি। ছবিটিতে ‘মনের রঙে রাঙাব বনের ঘুম ভাঙাব’ গানের সাথে নেচে গেয়ে আরেক জন নতুন শিল্পীর উত্তরণে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। সেই সময়ে আমি যে অবস্থানে ছিলাম কোনো নতুন নায়কের ছবিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে কাজ করার কথা নয়। বর্তমান প্রজম্মের কোনো জনপ্রিয় নায়ক আমার মত এভাবে কাজ করবে না।”
বিনয়ী ব্যক্তিত্ব। অর্থের পেছনে না ছুটে কাজের পেছনে ছোটা। রাজ্জাকের পুরো জীবন যেন চলচ্চিত্রের মতোই বৈচিত্র্যময়। আবার পরিপূর্ণ মানুষের মত অনুসরণীয়। ১৯৬৪ সালে শরণার্থী হয়ে ঢাকায় আসেন। তিনি বলতেন, ‘আমি আমার জীবনের অতীত ভুলি না। আমি এই ঢাকা শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি। না খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনোদিন আসেনি। ওটা আসেনি বলেই আজকে আমি এতদূর শান্তিতে এসেছি।’
এ প্রসঙ্গে সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘রাজ্জাকের বিনয়ের প্রেমে পড়েনি, এমন মানুষ বোধহয় নাই। এত জনপ্রিয় মানুষ হয়েও সে তার অতীতকে ভোলেনি। সিনিয়রদের সম্মান করা ছিল তার স্বভাবগত ব্যাপার। সে সব শ্রেণির মানুষকে শ্রদ্ধা করতো।’
ইত্তেফাক/নূহু