আবারো উত্তপ্ত রাখাইন

অস্তিত্ব সংকটে রোহিঙ্গারা

 
আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। গত শুক্রবার সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সংঘর্ষে হতাহতের পর কম্বিং অপারেশন চলছে। এই অভিযানে প্রতিদিন নিহত হচ্ছে নিরীহ রোহিঙ্গারা। সেনা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। এদের অনেকেই ভিড় করছে বাংলাদেশ সীমান্তে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহবান স্বত্ত্বেও সামরিক জান্তা সমর্থিত বর্তমান সরকার রোহিঙ্গাদের রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। বরং বলা চলে, রাষ্ট্রীয় মদদে দেশটির সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।
 
রোহিঙ্গা বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। মিয়ানমারে অব্যাহতভাবে জাতিগত নিপীড়নের শিকার হচ্ছে তারা। বিনা কারণে হত্যা করা হচ্ছে রোহিঙ্গা নর-নারীকে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী। কিন্তু এর কোনো বিচারই হচ্ছে না। মিয়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং, মংডু, কিয়কতাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা, কাইউকপাইউ, পুন্যাগুন ও পাউকতাউ এলাকায় তাদের নিরঙ্কুশ বাস। এছাড়া মিনবিয়া, মাইবন ও আন এলাকায় মিশ্রভাবে বসবাস করে থাকে। রোহিঙ্গাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। জাতিগত নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। বর্তমানে মিয়ানমারে ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গার বাস। কিন্তু এর বাইরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে আরো প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা, যারা নির্যাতনের মুখে বিভিন্ন সময় দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাখাইন রাজ্যের জন্য বিশেষভাবে গঠিত ‘অ্যাডভাইজরি কমিশন’ বা আনান কমিশন রোহিঙ্গাদেরকে বিশ্বের সর্ববৃহত্ দেশহীন সম্প্রদায় বলে উল্লেখ করেছে। শুক্রবার মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সংঘর্ষে ৮৯ জন নিহত হয়। এরপর শুরু হওয়া কম্বিং অপারেশনে মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় একশো’তে দাঁড়িয়েছে। দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (এআরএসএ) এই হামলার দায় স্বীকার করে আরো হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে।
 
গত বছরের অক্টোবরে এমন সহিংস ঘটনার পর সেনা অভিযান শুরু হয় রাখাইনে। সেনাদের হাতে শত শত রোহিঙ্গা নিহত ও নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা একে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করে। একইসঙ্গে সেনা অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল’ এর অভিযান বলে উল্লেখ করা হয়। ওই অভিযানের সময় থেকে গত এক বছরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব মিয়ানমারের সরকারকে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানালেও সরকার তা করেনি। বলা চলে এর মাধ্যমে অং সান সুচির এনএলডি সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের জন্য সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছে।
 
রাখাইনে হামলার একদিন আগেই সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানসহ মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহবান জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত অ্যাভাইজরি কমিশন। কফি আনান বলেন, অতিমাত্রায় বল প্রয়োগ করে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আসবে না। ভু-খন্ড রক্ষায় মিয়ানমারের সকল অধিকার রয়েছে। তবে সামরিকীকরণের মাধ্যমে রাখাইন অঞ্চলে শান্তি আনা সম্ভব হবে না। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকার ও আইনিক্ষেত্রে সমান অধিকার দিতে হবে। মানবাধিকারের প্রতি সম্মান না দেখালে রোহিঙ্গা এবং সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী কট্টরপন্থার দিকে ধাবিত হতে পারে। তিনি আরো বলেন, সুপারিশ গৃহিত এবং বাস্তবায়িত হলে রাখাইন রাজ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিপূর্ণ অবস্থা, উন্নয়ন এবং আইনের শাসনের প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠার উপায় বের হয়ে আসতে পারে।
 
রাখাইনে শুক্রবার সহিংসতার পর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিদার নুয়ার্ট এক বিবৃতিতে শনিবার বলেছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আরো সহিংসতা প্রতিরোধ ও অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশা করি, এক্ষেত্রে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি তারা সম্মান দেখাবে। কিন্তু মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির কার্যালয় থেকে সহিংসতা মোকাবেলার জন্য সেনাবাহিনীর প্রশংসা করা হয়েছে। একইসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ পরিচালনার মাধ্যমে জবাব দিচ্ছে সেনাবাহিনী। তবে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বলতে সুচি কি বোঝাতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার করেননি। ফলে রোহিঙ্গারা আবারো জাতিগত নির্মূল অভিযানের শিকার হতে যাচ্ছে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
 
ইত্তেফাক/কেকে