পালিয়ে এসেছে সোয়া লাখ রোহিঙ্গা

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলমান হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে এ পর্যন্ত ১ লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। গত সোমবার থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টাতেই বাংলাদেশে ৩৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের হত্যা, তাদের ঘরবাড়িতে আগুন ও নারীদের ধর্ষণ শুরু করে সেদেশের সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী। রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি বাস্তুহারা করতে অগ্নিকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীর সংগে যোগ দেয় রাখাইনের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও।

এদিকে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে ২৫ আগস্ট পুলিশ চেকপোস্টে ‘রোহিঙ্গা জঙ্গিদের’ হামলার ঘটনার জবাবে তারা ৩৭০ জন ‘রোহিঙ্গা যোদ্ধাকে’ হত্যা করেছে। তবে জাতিসংঘ দাবি করেছে এপর্যন্ত কমপক্ষে এক হাজার মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও বেসামরিক ব্যক্তিদের হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেও হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। তাদের ঘরবাড়িগুলো পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে এখনো আগুন জ্বলছে। সীমান্তের কাছে ১৫টি পয়েন্টে আগুনের কালো ধোঁয়া দেখা গেছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে, হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকবে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদিক টুইটারে জানান, লক্ষণসমূহ স্পষ্ট যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগে মিয়ানমার থেকে আরো বহু মানুষ বাংলাদেশে যাবে। আরো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাবে দুর্ভোগ আরো বাড়বে।

বিপজ্জনক সীমান্ত এলাকা পার হওয়া অভিবাসীদের ত্রাণ সহযোগিতা দেয়- মাইগ্র্যান্ট অফশোর এইড স্টেশন। সংস্থাটি বলেছে, তাদের কর্মকাণ্ড ভূমধ্যসাগর থেকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তর করছে রোহিঙ্গাদের সাহায্যে। রাখাইনে জাতিসংঘের ত্রাণ সহযোগিতা অর্থাত্ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ সহযোগিতা দিতে দেওয়া হচ্ছে না। ত্রাণকর্মীরা জানিয়েছেন, উল্টো ত্রাণসামগ্রীর গুদাম লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশের অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতেও খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা যাচ্ছে। বহু মানুষ মারাত্মকভাবে জখম ও অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন।  

গত মাস থেকেই রোহিঙ্গারা নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় দলে দলে বাংলাদেশের দিকে স্রোতের মতো আসতে শুরু করে। যারা বাংলাদেশে পর্যন্ত এসে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে পথে কয়েকদিন না খেতে পেরে, রোগেশোকে তাদের শারীরিক অবস্থা একেবারেই নাজুক। সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে দিনের পর দিন এখানে সেখানে লুকিয়ে, পাহাড়-জঙ্গল-নদী পেরিয়ে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে তখন তাদের জীবনীশক্তি একেবারে শেষ পর্যায়ে।

এরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে আশ্রয় নিয়েছে। কুতুপালং ও নয়াপাড়ার বিদ্যমান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিস ও টেলিগ্রাফ।

চট্টগ্রাম মেডিক্যালে গুলিবিদ্ধ ও অগ্নিদগ্ধ রোহিঙ্গারা

চট্টগ্রাম অফিস জানায়

মিয়ানমারে সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত রোহিঙ্গাদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য আনা অব্যাহত রয়েছে। গত এক সপ্তাহে নারী ও শিশুসহ প্রায় ২০ জন রোহিঙ্গা চিকিত্সার জন্য এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এখানে চিকিত্সা নিতে আসা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ গুলিবিদ্ধ আবার অনেকে গুরুতরভাবে অগ্নিদগ্ধ। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৪ রোহিঙ্গাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঝুপড়ি ঘর তৈরি করছে রোহিঙ্গারা

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান,

প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পাচ্ছে না। খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন-যাপন করছে তারা। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের খোঁজে পাহাড়-সমতল ও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। অচেনা এলাকায় যে যেখানে পারছে সেখানেই মাথা গোঁজার ঠাঁই নিচ্ছে। ফলে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সড়কের পাশে পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে গড়ে উঠছে ঝুপড়ি ঘর।

স্থানীয়রা জানান, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নতুন করে কয়েক হাজার ঝুপড়ি ঘর তৈরি করেছে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা। প্রতিটি সীমান্ত দিয়ে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে। শিশু-বৃদ্ধদের কোলে-কাঁধে করে নিয়ে আসছে তারা। যেসব সীমান্তে বিজিবির কড়া অবস্থান রয়েছে সেখানের জিরো পয়েন্টে অবস্থান করছে রোহিঙ্গা। রাতে কিংবা বৃষ্টিতে যে যার সুযোগ মতো বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে।

এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। উখিয়া-টেকনাফ উপজেলার বন বিভাগের জায়গা দখল করে আরো ৩টি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে।

তত্পর দালালরা

টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান,

রোহিঙ্গাদের নিয়ে অবৈধ ব্যবসা জোরেশোরে চলছে। ট্রলারযোগে রোহিঙ্গাদের এনে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হচ্ছে। টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকারসহ যাবতীয় কিছু ছিনিয়ে নিয়ে নিরীহ রোহিঙ্গাদের বন্দিশালায় আটক করে নির্যাতনের মাধ্যমে বিদেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা এবং স্থানীয়রা জানায়, মাথাপিছু দশ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের মুক্ত করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের সহায়তা করার অপরাধে এ পর্যন্ত ৪৩ জন দালালকে আটক করেছে। এতে ৪২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাইন উদ্দিন খাঁন জানান, রোহিঙ্গাদের সহায়তার নামে যারা অপরাধ করছে সে সব দালালকে ধরতে পুলিশ কাজ করছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৪২ দালালকে সাজা ও এক দালালকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে যারা ব্যবসা করবে তাদেরকে কিছুতেই ছাড় দেওয়া হবে না। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক জানান, দালালদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে বোট মালিক এবং জেলেদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভাও করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবারও দশ দালালকে আটক করা হয়েছে।

উখিয়া উপকূলে নৌকায় করে ছয় হাজার রোহিঙ্গা

উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, এবার সমুদ্রপথেও আসছে রোহিঙ্গারা। গতকাল উখিয়া উপজেলায় বঙ্গোপসাগরের তীরে ছোটবড় শতাধিক রোহিঙ্গা ভর্তি নৌকা ভিড়েছে। একেকটি নৌকায় ৪০ জন করে প্রায় ৬ হাজারের মতো শরণার্থী রয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। আগত রোহিঙ্গারা জানান, মিয়ানমারের বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল মংডু জেলার সীতার পাহাড় হয়ে নৌকা যোগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দেয়। প্রায় ৩ দিন বঙ্গোপসাগরের উত্তাল পানিতে ভাসার পর মঙ্গলবার বাংলাদেশের সীমানা, উখিয়া ও টেকনাফের উপকূলীয় এলাকা মনখালী, চোয়াংখালী, শামলাপুর ও রেজুর মোহনায় এসে পৌঁছে।  তাদের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে পাঠানো হয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু