নাব্যতা সংকটে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌপথে ফেরি পারাপার প্রায় বন্ধ হবার পথে। এ ঘাটে চলাচলকারী ২১টি ফেরির মধ্যে মাত্র ৪টি ছোট ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপারের চেষ্টা চলছে। এর ফলে ঘাটে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। অপরদিকে দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে চরম অব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকামুখী ঈদ ফেরত যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন ভোগান্তি। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে স্থানীয় পরিবহন ফেরিতে উঠছে। আর এ কারণে দূরপাল্লার পরিবহনগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও বিষয়টি স্বীকার করেছে।
মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান বলেন, পাটুরিয়া ঘাটে কোনো সমস্যা নেই। তবে কাটা প্যাসেঞ্জারের (যারা লঞ্চে পার হয়ে অন্য বাসে ওঠেন) চাপ বেশি। তবে কোনো অবস্থায় জনজট বলা যাবে না। তিনি বলেন, সমস্যাটা দৌলতদিয়ায়। সেখানেই তৈরি হচ্ছে যানজটের দীর্ঘ লাইন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, দৌলতদিয়া ঘাটে মেইনটেইনেন্সের কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তবে তিনি এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ঈদের সময় ১৯টি ফেরি চলাচল করেছে। বর্তমানে চলাচল করছে ১৬টি ফেরি।
দৌলতদিয়া ঘাটের অব্যবস্থাপনার ব্যাপারে রাজবাড়ির পুলিশ সুপারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দৌলতদিয়া ঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের কারণে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে শৃঙ্খলা ফেরানো তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে নাব্যতা সংকট তীব্র হওয়ায় পদ্মার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌপথে পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রুস্তম আলী খান জানিয়েছেন, সোমবার দুপুরে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান তাকে ফোনে জানিয়েছেন, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌপথে যেন ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান না পাঠানো হয়। পরে সমিতির পক্ষ থেকে ট্রাকচালকদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
দৌলতদিয়া ঘাটে ৫ কিমি যানজট: রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, ঈদের ছুটি শেষে এখন কর্মস্থলে ফেরা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের ঢল দৌলতদিয়া ঘাটে। সেই সাথে তাদের বয়ে নিয়ে আসা যানবাহনের চাপে ঘাট এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নারী ও শিশুদের।
ঝিনাইদহ থেকে আসা যাত্রী রূপা দে জানান, স্বামী ও শিশু কন্যাকে নিয়ে রাত ১২টার দিকে বাসে উঠেছিলেন। দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে পৌঁছান রাত দেড়টায়। কিন্তু সকাল ৮টা পর্যন্ত বাস ফেরিতে উঠতে পারেনি। শেষটায় বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে নেমে লঞ্চযোগে পাটুরিয়া পৌঁছাই।
কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেন, স্থানীয় পরিবহনগুলো কোন ধরনের নিয়মের তোয়াক্কা না করে ফেরিতে উঠে পড়ে। এ অবস্থায় দূরপাল্লার গাড়িগুলো ১/২টার বেশি উঠতে পারে না। এ কারণেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সোমবার বিকেল থেকে একযোগে শত শত যানবাহন ও অসংখ্য মানুষ নদী পারাপার হওয়ার জন্য দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় আসতে শুরু করে। গতকাল মঙ্গলবার এ চাপ আরো বৃদ্ধি পায়। এতে বিকাল ৪টা নাগাদ ফেরি ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে মহাসড়কের গোয়ালন্দ বাজার পদ্মার মোড় এলাকা পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুটে নাব্যতা সংকট:শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, ব্যস্ততম শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুটে নাব্যতা সংকট প্রকট রূপ নেওয়ায় কর্মস্থলমুখী যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। স্রোতের কারণে পদ্মায় ড্রেজার বসানো কঠিন হয়ে পড়ায় সংকট উত্তরণে শীঘ্রই সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। বন্ধ হয়ে গেছে ৭টি ডাম্ব ও ৪টি রো রো ফেরি। কয়েকটি ছোট ফেরি নামেমাত্র চলছে। ফলে ঘাটে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
লঞ্চ মাস্টার আল-আমিন বলেন, নদীতে দ্রুত পানি কমে বিভিন্ন স্থানে ডুবোচরের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে প্রায়ই ডুবোচরে ধাক্কা লেগে লঞ্চের পাখা ভেঙে ক্ষতি হচ্ছে।
রো রো ফেরি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর এর মাস্টার ইনচার্জ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, নদীতে দ্রুত পানি কমে চ্যানেলগুলোতে ভয়াবহ নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। রো রো ফেরি চলাচল করতে পানির গভীরতা লাগে ৭ থেকে ৮ ফুট। কিন্তু চ্যানেলগুলোতে এখন পানির গভীরতা রয়েছে ৫-৬ ফুট, তাই কর্তৃপক্ষের আদেশে ফেরি বন্ধ রেখেছি।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ বলেন, নদীতে নাব্যতা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তাই বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসিসহ সকল বিভাগের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী যানবাহনগুলোকে ভাঙ্গা থেকে অন্য রুট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আদায় হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া:শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সরেজমিন ঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফেরি-লঞ্চ ও ট্রলারে মানুষ নদী পার হয়ে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকা থেকে বিআরটিসি, নবীনবরণ, যাত্রীসেবা, পদ্মা প্রভৃতি বাস যোগে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দিচ্ছে। এ সুযোগে প্রতিটি পরিবহনে স্বাভাবিক সময়ের চাইতে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ইত্তেফাক/নূহু