রাজধানীর দারুসসালামের বর্ধনবাড়ির জঙ্গি আস্তানা ‘কমল প্রভা’য় শুক্রবার তল্লাশি অভিযানের শেষ দিনে সেখান থেকে ২ টি ফ্রিজ বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে নিহত আব্দুল্লাহর বোমা তৈরির কারখানা থেকে ২৩ টি ফ্রিজ উদ্ধার করেছে র্যাব। এই ২৩ টি ফ্রিজের মধ্যে দুইটি ফ্রিজে বোমা ছিল বলে জানিয়েছেন র্যাবের মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান। তিনি বলেন, পুরাতন ও নষ্ট ফ্রিজ কিনে এনে সেগুলো মেরামত করতেন আব্দুল্লাহ। মেরামত করার আড়ালে তিনি ফ্রিজ বোমা তৈরি করেছেন। এছাড়া সেখান থেকে ৭টি শক্তিশালী বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে। বোমায় ব্যবহৃত অন্তত এক হাজার ‘ইগনিশন কর্ক’ উদ্ধার হয়েছে। প্রতিটি কর্ক একটি বোমায় ব্যবহৃত হয়। অভিযান শেষে বাড়িটি বিস্ফোরকমুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
এ নিয়ে গত ৫ দিনের অভিযানে বাড়িটি থেকে তিন ধরনের ১৭টি শক্তিশালী বোমা, ৩০টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৫০টি কেমিক্যাল বোমা, এক কন্টেইনার এসিড, ১০ কেজি গান পাউডার, ৩ কেজি সালফার, ৮ থেকে ১০টি কন্টেইনারে দাহ্য পদার্থ, স্প্লিনটার, কয়েক কেজি চারকোল ও শতাধিক নানা ধরনের অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হলো।
বর্ধনবাড়ির ২/৩-বি ‘কমল প্রভা’ বাড়িটি বসবাসের উপযোগী কিনা জানতে চাইলে র্যাবের পরিচালক বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার পর তা জানানো যাবে। বাসিন্দাদের অপেক্ষা করতে হবে। বিস্ফোরণে দু’টি ফ্লোর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সেটা টেকনিক্যালি পরীক্ষা ছাড়া বসবাসের জন্য কতটুকু নিরাপদ তা বলা যাচ্ছে না।
কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান আরো বলেন, জঙ্গি আব্দুল্লাহর লাশ নিতে তার পরিবার অস্বীকার করেছে। বাকি দুই সহযোগীর পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমরা জানতে পেরেছি, ওই বাসায় জঙ্গি আবদুল্লাহর সঙ্গে আরও ৫-৬ জনের যাতায়াত ছিল। টেকনিক্যাল কারণে এসব বিষয় আমরা জানাতে পারছি না। যেহেতু মরদেহগুলো একেবারেই পুড়ে গেছে সেজন্য তাদের ডিএনএ টেস্ট করে শনাক্ত করতে হবে। এছাড়া ছয়তলা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, আব্দুল্লাহ ওই বাড়ির তিনটি ফ্ল্যাট নিয়ে বসবাস করছিলেন। একটিতে কবুতর খামার, আরেকটিতে ফ্যাক্টরি বা ল্যাবরেটরি গড়ে তুলেছিলেন। অন্যটিকে পরিবার নিয়ে থাকতেন। প্রতিটি ফ্ল্যাটের ভাড়াই ছিল ১৫ হাজার টাকা করে। সে হিসেবে ৪৫ হাজার টাকা শুধু ভাড়াই ছিল। এরসঙ্গে আনুষঙ্গিক মিলিয়ে তার প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হতো। তার সঙ্গে দুইজন সহযোগী ছিল। তাদের মাসিক বেতন ন্যূনতম পনের হাজার টাকা করে হলেও ৩০ হাজার টাকা হবে। সবমিলিয়ে লাখ টাকার উপর খরচ ছিল আব্দুল্লাহর। আব্দুল্লাহ তার আইপিএস-ইউপিএস নিজস্ব লোক দিয়ে পুরনো ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটে বাজারজাত করতেন। তার প্রায় কোটি টাকার কবুতর ছিল। এর মধ্যে কোনো কোনো কবুতরের একজোড়ার দাম ছিল কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত। ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব কবুতর বিক্রি করতেন। এসব কবুতর বিদেশ থেকে আমদানি করতেন আব্দুল্লাহ। বিস্ফোরণে অন্তত শ’খানেক কবুতর মারা গেছে। বাকিগুলোর পরিচর্যা করা হচ্ছে। সেগুলো সুস্থ হওয়ার পর সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মাজার রোডের বর্ধনবাড়ির ২/৩/বি নম্বর ছয়তলা বাড়িতে জঙ্গি আস্তানাটির সন্ধান পায় র্যাব। অভিযানের আগে বাড়িটির ২৪টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২৩টি ফ্ল্যাটের ১৫ জন শিশু, ২৪ জন নারী ও ২৬ জন পুরুষ সদস্যকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর থেকেই আস্তানায় থাকাদের আত্মসর্মপণ করার আহ্বান জানানো হচ্ছিল। এক পর্যায়ে আব্দুল্লাহর প্রতিবন্ধী বোন মেহেরুন্নেছা আত্মসর্মপণ করেন। পরবর্তীতে আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে অন্যদের আত্মসর্মপণ করানোর চেষ্টা করা হয়। মঙ্গলবার আব্দুল্লাহ রাজি হয়েও শেষ পর্যন্ত আত্মসর্মপণ না করে রাত দশটার দিকে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। বুধবার আস্তানাটি থেকে ৭টি মাথার খুলি ও পুড়ে একপ্রকার কয়লা হয়ে যাওয়া শরীরের বিভিন্ন পোড়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উদ্ধার করা হয়।
ইত্তেফাক/এমআর