ক্ষতির আশঙ্কায় কৃষক
শ্যামলেন্দু পাল, নেত্রকোনা প্রতিনিধি
নেত্রকোনা জেলার হাওর উপজেলাগুলোতে বোরো জমির ধান চিটা হয়েছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ঠান্ডাজনিত কারণে (কোল্ড ইনজুরি) ফসলের এ ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষকদের ধারণা। হাওর এলাকার প্রাং ৬ হাজার হেক্টর জমি কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। এরমধ্যে ৫০ ভাগ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় গাজীপুর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তিন বিজ্ঞানী গত শনিবার নেত্রকোনার হাওর এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই বীজতলা নির্মাণ এবং নির্ধারিত সময়ের ৪০ দিন পূর্বে চারা রোপণের কারণে কোল্ড ইনজুরিতে বোরো জমি আক্রান্ত হয় বলে কৃষি বিভাগের বিজ্ঞানীরা জানান।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলার পাঁচটি হাওর উপজেলাসহ ১০টি উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৫২ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬শ হেক্টর। এরমধ্যে ২৩,৮০০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান, ১,৬০,৪৮০ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল এবং ৩২০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের বোরো আবাদ করা হয়েছে।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান জানান, হাওর উপজেলা মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরি এবং কলমাকান্দা উপজেলার ছয় হাজার হেক্টর জমি কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ২৫২০ হেক্টর জমির ধান চিটা হয়েছে। বাকি ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে ৫০ ভাগ ফলন পাওয়া যাবে।
মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাউতা হাওরের কৃষক সোনা মিয়া এবং কামাল পাশা বলেন, তারা ব্রি-২৮ ধান নভেম্বর মাসে আবাদ করায় কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। আবাদের নিয়ম না মেনে এই ধান আবাদ করায় এখন তারা ক্ষতিগ্রস্ত। সেচ সুবিধা পাওয়ার জন্য তারা আগাম সময়ে বীজতলা তৈরি করে ধান রোপণ করেন। ফলে তাদের জমি কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়।
গাজীপুর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহম্মদ আশিক, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হীরেন্দ্র নাথ বর্মন, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অফিসার ড. তুহিনা খাতুন গত শনিবার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি এবং মদনের হাওর এলাকাগুলোর বোরো জমি পরিদর্শন করেন এবং কৃষকদের সাথে কথা বলেন। এ ব্যাপারে তারা কৃষকদের কিছু পরামর্শ প্রদান করেন বলেও জানান।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, হাওর এলাকায় বোরো ধানের জমিতে চিটা হলেও তা আশঙ্কাজনক নয়। বর্তমানে কৃষকরা ধান কাটা শুরু করেছেন এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ৫০ থেকে ৭০ ভাগ জমির বোরো ধান কাটা শেষ হবে।
নেত্রকোনা জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আনিসুর রহমান বলেন, হাওরে বোরো ধান চিটা হওয়াতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং যতটুকু ধান কৃষকরা উঠাতে পারছেন, তার ন্যায্যমূল্য যাতে পায় সেদিকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এদিকে, মদন (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, মদন উপজেলার হাওরাঞ্চলে ব্রি ধান-২৮ কাটা শুরু হয়েছে। অধিকাংশ জমির আধাপাকা ধান চিটা হয়ে যাওয়ায় উত্পাদন খুবই কম। আবার অনেকেই এক মুষ্টি ধান ঘরে তুলতে পারবে না বলে জানা যায়। যেখানে প্রতি একরে ৭০/৮০ মণ ধান উত্পাদন হওয়ার কথা সেখানে কৃষক পাচ্ছে ১৫/২০ মণ ধান। ফসলি মাঠ জুড়ে কৃষকদের মাঝে শুরু হয়েছে হাহাকার।
উচিতপুর কয়ার হাওরের কৃষক রুবেল, আব্দুর রশিদ, কাশেম, সামছুল আলম ভূঁইয়া ও তলার হাওরের কৃষক ফতেপুর গ্রামের হারেছ তালুকদার,মন্নাফ, বালালী গ্রামের রোকন, বাঘমারা গ্রামের আনার মিয়া, লুহিট মিয়া, মৌলা মিয়া জানান, এবার বর্ষার পানি আগাম সরে যাওয়ায় আগাম বন্যার ভয়ে অন্যান্য বছরের চেয়ে জমিতে ধান আগাম রোপণ করেছিলাম। কিন্তু ঠান্ডাজনিত কারণে ধান পুষ্ট না হয়ে শীষ সাদা হয়ে মরে যাচ্ছে। আমাদের বেশিরভাগ জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। আবার আমরা যে সব জমিতে প্রতি একরে ৭০/৮০ মণ ধান পাই সেখানে এবার ১৫/২০ মণ ধান পাওয়া যাচ্ছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী জানান, বর্ষার পানি আগে নেমে যাওয়ায় আগাম বীজতলা ও জমি রোপণ করায় এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বছরের শুরু থেকেই কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ পরামর্শ দিয়ে আসছি। এ বছর ব্রি ধান-২৮ নিয়ে কৃষকগণ সমস্যায় পড়েছে। আমরা পৌরসভাসহ উপজেলার ৮ ইউনিয়ন সার্ভে করে ১ হাজার ২শ হেক্টর জমি ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করেছি।
মদন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোলাম রাসূল জানান, ধান গবেষণা কেন্দ্র থেকে লোকজন এসে ফসলি জমিতে কোল্ড ইনজুরি ছাড়া অন্য কোনো রোগবালাই নেই বলে জানান। তবে এ বছর কৃষকদের খুব দুর্দিন। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।