নড়িয়া ও জাজিরায় ২১ হাজার পরিবার গৃহহীন ঝুঁকিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

পদ্মা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত ১৫ দিনে শরীয়তপুরের নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলায় ৭৫০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। এ নিয়ে এবছর ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে ৩ হাজার ৭৪০ পরিবার। গত পাঁচ বছরে গৃহহীন হয়েছে ২১ হাজার পরিবার।

গত সোমবার ভোররাতে নদী ভাঙনের কারণে নড়িয়া উপজেলার ওয়াপদা লঞ্চঘাটের পন্টুন বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনটি লঞ্চ ডুবে যায়। নিখোঁজ হয় লঞ্চে থাকা ১৬ ব্যক্তি। এর আগে ২০১৩ সালে নদী ভাঙনের কারণে একই উপজেলার সাধুর বাজার ঘাটে একটি লঞ্চ ডুবে যায়। তখন লঞ্চের ৬ কর্মী নিখোঁজ হয়। এছাড়া গত বছর জাজিরার কলমিরচর এলাকায় ভাঙনে মাটি ধসে তিন ব্যক্তি নিহত হয়।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনসূত্র জানায়, শরীয়তপুরের জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলাটির অধিকাংশ এলাকা জুড়ে পদ্মা নদী। জাজিরার পালেরচর থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পদ্মার ভাঙন দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভাঙন হচ্ছে নড়িয়ার মোক্তারেরচর, কেদারপুর, চরআত্রা, নওপারা ও ঘড়িসার, জাজিরার কুণ্ডেরচর, বড়কান্দি ও জাজিরা ইউনিয়নে।

জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত নড়িয়া ও জাজিরায় পদ্মা নদী ভাঙনে ২০ হাজার ৮৯০ পরিবার গৃহহীন হয়েছে। এর মধ্যে এ বছর গৃহহীন হয়েছে ৩ হাজার ৮৯০ পরিবার। পাঁচ বছরে ফসলি জমি বিলীন হয়েছে ছয় হাজার হেক্টর। প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০টি, উচ্চ বিদ্যালয় ছয়টি। সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য স্থাপনা। জাজিরার কলমিরচর বাজার, কায়ুম খার বাজার, দুর্গারহাট বাজার, পালেরচর বাজার, নড়িয়ার ওয়াপদা বাজার, বাঁশতলা বাজার, চণ্ডিপুর বাজার পুরো বিলীন হয়ে গেছে। সুরেশ্বর বাজারের দুই শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে।

এবছর পদ্মা নদী বিভিন্ন স্থানে পাঁচশ’ মিটার হতে আটশ’ মিটার পর্যন্ত ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেছে। নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি মুলফত্গঞ্জ বাজারে অবস্থিত। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পদ্মা নদীর দূরত্ব ১৫০ মিটার। ওই স্থান দিয়ে ব্যাপক ভাঙন চলছে। গত ১৫ দিনে ওই স্থান দিয়ে ভেঙে পদ্মা নদী পাঁচশ’ মিটার ভেতরে প্রবেশ করেছে।

নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুনীর আহমদ খান বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের খুব কাছে পদ্মা নদী চলে এসেছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে এ কথা দুই সপ্তাহ আগে চিঠি দিয়ে স্থানীয় সাংসদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বিভাগীয় পরিচালককে জানানো হয়েছে।

জাজিরার দুর্গাঘাট থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর লঞ্চঘাট পর্যন্ত সাড়ে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত এ বছর জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাপক ভাঙনের আশঙ্কা করা হয়েছিল। ব্র্যাক ওই এলাকায় একটি গবেষণা করে এমন তথ্য স্থানীয় জনতা ও প্রশাসনকে অবহিত করে। তারা গত জুনে ওই সাড়ে ১২ কিলোমিটার এলাকায় জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য লাল ও হলুদ পতাকা টাঙিয়ে দেন।

জাজিরা উপজেলার কুণ্ডেরচর কালু বেপারী স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সুরুজ মিয়া বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানটি আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। কোথায়ও জায়গা না পেয়ে পাশের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও মাঠে পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছি।

শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বিশ্বজিত্ বৈদ্য বলেন, পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে গত পাঁচ বছরে জাজিরা ও নড়িয়ায় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। জাজিরার কুণ্ডেরচর থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণ ও চর খনন করার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন থেকে একনেকে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ১২৮০ কোটি টাকার ওই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হলে আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে এ এলাকায় ভাঙন রোধ করা যাবে।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে।

ইত্তেফাক/নূহু