নদী ভাঙন :দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিবছর হাজারো মানুষ গৃহহীন

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নদী ভাঙনের শিকার হয়ে প্রতি বছর হাজারো পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। ভূমিহীন এ পরিবারগুলো বেড়িবাঁধের উপর আশ্রয় নেয়া ছাড়াও জীবন-জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমায় রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোতে।

নদী ভাঙনের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছে, গত ৪৬ বছরে এ অঞ্চলের ১৫টি নদীর কড়াল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম। এসব গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারের সর্বস্ব নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। খোদ নগরসংলগ্ন চরবাড়িয়া, চরমোনাই, চরকাউয়া, চরআইচা ও চরবদনার অব্যাহত ভাঙনে ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যক মসজিদ, স্কুল, ইটের ভাটাসহ কয়েক হাজার ঘরবাড়ি কীর্তনখোলা নদীতে বিলীন হয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমের ভাঙনে নগর সংলগ্ন চরকাউয়া, চরআবদানি, কালিজিরা পয়েন্ট চরম হুমকির সম্মুখীন। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের কালীগঞ্জ, রাজাপুর ও আটহাজার নামের তিনটি গ্রাম বহু আগেই বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রামের এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। গত বছর নভেম্বর মাসে নগরীর ২৬নং ওয়ার্ডের কালিজিরা পয়েন্টে আকস্মিক তীব্র ভাঙনে এক রাতেই ১৫টি বাড়িঘরসহ বিশাল এলাকা বিলীন হয়ে যায়। ভাঙনে ওই এলাকার দক্ষিণ জাগুয়া এলাকার ফসলি জমি, বসতঘরসহ প্রায় তিন একর জমি বিলীন হয়ে যায়।

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর, গোবিন্দপুর, উলানিয়া, জাঙ্গালিয়া, ভাষাণচর, বাগরজা, শিন্নির চর নদী ভাঙনের কবলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে। উলানিয়া গ্রামটি এখন মেঘনার ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে। সেখানকার কালিরবাজার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর এখন উলানিয়া মিয়া বাড়ি ও বড় বাজার হুমকির মুখে পড়েছে।

মেঘনার ভাঙনে পুরান হিজলা, চর মেমানিয়া, মৌলভীরহাট, গঙ্গাপুর, হরিনাথপুর, মল্লিকপুর, বাউশিয়া, বাহেরচর, হিজলা-গৌরবদী ও পালপাড়া গ্রামের কয়েক হাজার ঘর, ১০টি স্কুল এবং ৩টি হাটবাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ওই সকল এলাকার কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ও ১২টি স্কুল-মাদ্রাসা ভাঙনের মুখে পড়েছে। হিজলা গৌরবদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মিলন জানান, বিগত ১৫ বছরের ভাঙনে হিজলার অর্ধেক এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এ উপজেলার প্রায় ১৫ হাজার একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ৫ হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে শহরমুখী হয়েছে। ১০ হাজার পরিবার উপজেলার বিভিন্ন চরের ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

নগর সংলগ্ন দপদপিয়া-নলছিটি সড়কের মল্লিকপুর নামক স্থানে সুগন্ধা নদীর ভাঙনে প্রধান রাস্তা হুমকির সম্মুখীন।  সরেজমিনে দেখা গেছে ভাঙনে নদী থেকে ওই রাস্তার দূরত্ব মাত্র ১০০ মিটার। স্থানীয় সূর্যপাশা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল হাই জানান, বিগত ১০ বছরের ভাঙনে মল্লিকপুরের প্রায় ৫০ একর জমি বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে এ রাস্তাটি নদীগর্ভে বিলীনের পথে। এতে করে বরিশালের সাথে নলছিটি, ঝালকাঠী, মোল্লারহাট, ঘোষকাঠী যাতায়াতের একমাত্র সড়ক পথটি বন্ধ হয়ে যাবে।

ভাঙন কবলিতরা জানান, প্রতি বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে দূরে গিয়ে নতুন কোনো বেড়িবাঁধে বসতি গড়ে ভাঙন কবলিত মানুষ। এক সময় যাদের ছিল গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, শস্য ভরা মাঠ তারাই নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে এখন নগর জীবনে হতদরিদ্র মানুষের তালিকাভুক্ত হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু