নতুনরূপে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত

শামীম হামিদ, চট্টগ্রাম অফিস

চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের অবস্থান। দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এবং নৌবাহিনী ঘাঁটি বিএনএস ঈসা খান পতেঙ্গা সৈকতের খুব কাছেই অবস্থিত। পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়ানোর জন্য সারাদেশের পর্যটকদের কাছে খুবই প্রিয় এক নাম পতেঙ্গা সৈকত। ছুটির দিনসহ সপ্তাহের প্রায় প্রতিটি দিনই নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো সৈকত এলাকা। অথচ কিছুদিন আগেও এই সৈকতে ঘুরে বেড়ানোর মতো পরিবেশ ছিল না। ঘিঞ্জি বস্তির মতো ঝুপড়ি দোকান আর ফেরিওয়ালার উত্পাতে কোথাও একদণ্ড বসার উপায় ছিল না। সৈকতে বাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য বেড়ে যেত। গাড়ি পার্কিং সুবিধা না থাকায় মূল সড়ক কিংবা বেড়িবাঁধের ওপর এলোমেলো করে গাড়ি রাখা হতো। ফলে সৈকত এলাকায় সৃষ্টি হতো তীব্র যানজট। ছিল মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের উত্পাত। নানামুখী বিড়ম্বনা নিরাপত্তা ঝুঁকি মাথায় নিয়েই প্রতিনিয়ত অসংখ্য পর্যটক পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত দর্শন করতে আসতেন।

তবে অচিরেই এই বিড়ম্বনার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে পতেঙ্গা সৈকতকে। পর্যটকদের হাঁটার জন্য সমুদ্রের তীর ঘেঁষে ইতোমধ্যেই নির্মাণ করা হয়েছে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে; যেখানে একসঙ্গে হাঁটতে পারবেন ৫০ হাজার মানুষ। তাদের জন্য বাড়তি পাওনা হিসেবে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান। পর্যটকদের বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে রঙ-বেরঙের পাথরের আসন। যে কারণে বেড়াতে আসা লোকজনের মধ্যে আর আগের মতো ভয় কাজ করে না। অনেক পরিবার এখন সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত সৈকতে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ান যা কিছুদিন আগে কল্পনাও করা যেত না। পতেঙ্গা সৈকত নব আঙ্গিকে দৃষ্টিনন্দন রূপে আবির্ভূত হয়েছে পর্যটকদের জন্য।

সৈকতের শেষ প্রান্তে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত হচ্ছে টানেল। টানেল সন্নিহিত এলাকায় নির্মিত হচ্ছে ১৭ কিলোমিটারব্যাপী সিটি আউটার রিং রোড। আনুষ্ঠানিকভাবে এই রিং রোড খুলে দেওয়া না হলেও সমুদ্রের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিদিন সেখানে নানা বয়সের অসংখ্য মানুষ ভিড় জমান। তাদের মধ্যে কেউ ব্যস্ত থাকেন সুসজ্জিত ফুলের বাগানে ছবি তোলার কাজে। কেউ পাথরের আসনে বসে বিশ্রাম নেন। অনেকেই আবার ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করেন। ছোটদের যেন আনন্দের সীমা নেই। তারা ওয়াকওয়ে থেকে সিঁড়ি বেয়ে সৈকতের বালুকাবেলায় ছুটোছুটি করে বা খেলায় মেতে ওঠে। পর্যটকদের অনেকে পানিতে নেমে ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালী করেন। আবার কেউবা স্পিডবোট বা দেশি সাম্পানে চড়ে সমুদ্র ভ্রমণের স্বাদ নেন। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় রয়েছে টুরিস্ট পুলিশ ও বিচ কমিউনিটি পুলিশ। শুক্রবারসহ ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের চাপ বেশি থাকলে সাদা পোশাকেও পুলিশ দায়িত্ব পালন করে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, নতুন রূপে সজ্জিত পতেঙ্গা সৈকতের বাকি অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হলে নান্দনিক সৌন্দর্যে অদূর ভবিষ্যতে কক্সবাজারকেও ছাড়িয়ে যাবে। জানা গেছে, পুরো এলাকাটিকে দুটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। জোন ওয়ান হচ্ছে সমুদ্র সৈকত। জোন টু হচ্ছে পাঁচ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে শেষে রিং রোড। সেখান থেকে আসা-যাওয়া করার জন্য ক্যাবল কারের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে ফাইভ স্টার হোটেল, কনভেনশন হল, শপিং মলসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত এলাকা গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে জোন ওয়ান জনসাধারণের জন্য বিনোদনের উপযোগী হয়ে উঠেছে। জোন ওয়ানের মধ্যে ৩০ ফিটের সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে রয়েছে। এছাড়া এ জোনে একটি বিশাল প্লাজা থাকবে। ৭০০ গাড়ি রাখার জন্য পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গাড়ি পার্কিংয়ের রাস্তাটি হবে টানেল এবং সৈকত সড়কের মাঝামাঝি। সৈকতের প্রধান সড়কটিকে ৮০ ফুট প্রশস্ত করা হচ্ছে। এ সড়ক দিয়ে মূলত সব গাড়ি প্রবেশ করবে ও বের হবে। সৈকত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করা হবে। সৈকত এলাকায় ছোট ও বড়োদের জন্য বিভিন্ন রাইড থাকবে। এর মধ্যে শিশুদের জন্য কিছু সহজ রাইড থাকবে। ওয়াকওয়ের ওপরে থাকবে ক্যাবল কার।