চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুরো ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ভাঙচুর করা হয় ডিবি পুলিশের গাড়ি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৩০ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। এ সময় তিন পুলিশ সদস্যসহ ছাত্রলীগের ২০ কর্মী আহত হন।
ছাত্রলীগের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে গতকাল রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রধান ফটকে তালা দিয়ে শাটল ট্রেনের হোস পাইপ কেটে ক্যাম্পাসে সকল ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চলাচলেও বাধা দেয় আন্দোলনকারীরা। এতে অধিকাংশ বিভাগে পরীক্ষা ও ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ।
যেভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত :বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, কারাগারে থাকা অস্ত্র মামলার আসামি ছয় ছাত্রলীগ কর্মীর মুক্তি, সকল রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, হাটহাজারী থানার ওসির প্রত্যাহার ও প্রক্টরের পদত্যাগ দাবিতে এই ধর্মঘটের ডাক দেয় ছাত্রলীগের একাংশ। ধর্মঘটের শুরুতেই তারা শাটল ট্রেন আটকে কয়েকটি বগির হোস পাইপ কেটে দেয় এবং শিক্ষক বাসের চাকার হাওয়া ছেড়ে দেয়। সকাল পৌনে ৯টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এ সময় তারা প্রধান ফটক আটকে দিয়ে চার দফা দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। ১১টার দিকে প্রধান ফটকের সামনে পুলিশ জলকামান নিয়ে এলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা ফটক লাগিয়ে পুলিশকে ধাক্কা দেয়। এতে উভয় পক্ষ বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়লে শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। পরে ছাত্রলীগ কর্মীরা শিক্ষক ক্লাব ও শাহ জালাল হলের সামনে অবস্থান নিয়ে পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। তারা ডিবি পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ও বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এ সময় ২০ ছাত্রলীগ কর্মী আহত হন। এ ছাড়া ছাত্রলীগের ছোড়া ইট-পাটকেলে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
ক্যাম্পাসে যেতে শিক্ষার্থীদের বাধা
এদিকে আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে সকালে ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষকদের কোনো বাস শহরে যেতে পারেনি। বন্ধ রয়েছে রিকশা ও সিএনজি চলাচলও। এছাড়া পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আসা শিক্ষার্থীদের রাস্তায় বাধা দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রীমা সিদ্দিকা বলেন, ‘সকালে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য নগরীর মুরাদপুরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাওয়ার ৩ নম্বর বাসে উঠি। কিছুক্ষণ পর ছাত্রলীগ কর্মীরা আমাকে বাস থেকে নামিয়ে দেয়। পরে রিকশা দিয়ে জিরো পয়েন্টে আসি। কিন্তু আমাকে ক্যাম্পাসের ভিতরে যেতে বাধা দেওয়া হয়। পরে আমি বোটানিকাল গার্ডেন হয়ে পরীক্ষা দিতে যাই।’
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি সুজন বলেন, ‘আমরা একটি যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছিলাম। প্রশাসন আমাদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু ছাত্রলীগ নামধারী কিছু অনুপ্রবেশকারী পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাব।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মশিউদ্দোলা রেজা সংঘর্ষের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ বিনা উসকানিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি!
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর মোহাম্মদ আলী আজগর চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। ছাত্রদের অস্ত্র মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত ২ এপ্রিল ছাত্রদের নামে যে অস্ত্র মামলা হয়েছে, সেখানে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় তাদের কাছ থেকে রামদা, লোহার রড ও হকিস্টিক পাওয়ার কথা উল্লেখ করা আছে। এরপরও আমরা পুলিশ প্রশাসনকে বলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য তারা যেন ভূমিকা নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় স্বাগত জানায়। কিন্তু তাদের নিজেদের সমস্যার কারণে মামলা হয়েছে, এর সমাধানে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা থাকবে।
দুই কনস্টেবল গুলিবিদ্ধ
এদিকে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে বন্দুক নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ট্রিগারে চাপ লেগে দুই কনস্টেবল হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে তাদের নাম জানা যায়নি। জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা ইত্তেফাককে বলেন, বন্দুক নাড়াচাড়া করার সময় অসাবধানতাবশত এ ঘটনা ঘটেছে। আহতরা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়েছেন।