গত কয়েকদিন ধরে অসুস্থ কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপার্সন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য প্যারোল প্রসঙ্গ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুইদিন আগে বলেছিলেন, ‘বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তির আবেদন পেলে বিবেচনা করবে সরকার। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শিয়ে আমাদের কাছে আবেদন করতে হবে।’
যদিও বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা প্যারোলে মুক্তির আবেদন করার বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বলছেন, প্যারোল চাওয়া না চাওয়ার এখতিয়ার খালেদা জিয়ার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এতে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিছু নেই। সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে। বিএনপি প্যারোল চাইবে না। শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্যজনিত কারণে বেগম জিয়াকে জামিনে মুক্তি দিতে হবে। মুক্তি পেয়ে তিনি যেখানে খুশি সেখানে চিকিত্সা নিতে পারবেন। সরকার নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করা হবে।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আমরা প্যারোলের কথা বলিনি। আমরা প্যারোল চাইবো না, জামিনে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি করছি। সরকার আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার না করে আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিলে তিনি জামিনে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য। যে মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে সেখানে আমরা আইনগতভাবে জামিন পেতে পারি।
দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তির আবেদন করবেন কি-না সেটি একান্তই তার ব্যাপার। এখানে বিএনপি কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। যদিও তার গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা তার উন্নত চিকিত্সার দাবি জানিয়ে আসছি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, অনুকম্পা বা দয়ায় হবে না, আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করতে হবে নেত্রীকে।
স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, শেখ হাসিনা প্যারোলে মুক্তি নিয়েছেন; কিন্তু খালেদা জিয়া প্যারোল নেন নাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশে করে বলেন, খুব বেশিদিন নেই- আপনাদের নেতাকে জনগণের কাছে প্যারোল চাইতে হবে। জনগণের নেত্রী জনগণের মাঝে আসবে জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে। কারো অনুকম্পা চাই না।
বেগম জিয়ার অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সরকার নিঃশর্তভাবে খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে। প্যারোলের বিষয়টি রাজনৈতিক। এখানে তিনি প্যারোলে যাবেন কি না এবং সরকার প্যারোল দিবেন কি না, এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমরা আইনজীবী হিসেবে বলতে পারি চিকিত্সার জন্য প্যারোল পাওয়া যায়।
এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গতকাল রাজধানীতে বিএনপির গণঅনশনে ২০ দলীয় ঐক্যজোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেন, প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার কথা বলে খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে চিরদিনের জন্য বিতাড়িত করতে চায়। রাজনীতি করা যাবে না— এই শর্তে তাকে প্যারোল দিতে চাচ্ছে সরকার। সেটা হলে এদেশে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মৃত্যুর মতোই গণতন্ত্রের মৃত্যু হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য অচিরেই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে যাবে বিএনপি, ২০ দলীয় ঐক্যজোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ঐক্যফ্রন্ট নেতা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, বঙ্গবন্ধু যেমন প্যারোলে লাহোরে যাননি, তেমনি বেগম জিয়াও আজ প্যারোলে মুক্তি না নিলে সেটা হবে দ্বিতীয় নজিরবিহীন ঘটনা। প্যারোলে মুক্তি মানে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু, গণতন্ত্রের মৃত্যু।
এদিকে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন। শারীরিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়লে মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ মেনে গত ১ এপ্রিল তাকে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। চিকিত্সকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার পুরো শরীর ব্যথায় আক্রান্ত। অন্যের সাহায্য ছাড়া তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন না। প্রসঙ্গত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের পর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে রয়েছেন খালেদা জিয়া। পরে সে মামলায় সাজার মেয়াদ বাড়িয়েছে উচ্চ আদালত। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্য ৩৪টি মামলার মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া চলছে দুই মামলার।