রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী

মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও ত্রাণ বিতরণে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গতকাল শনিবার সকাল থেকে তারা কাজ শুরু করে। এর আগে সেনাবাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় এসে চলমান প্রতিটি কাজ পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিক ধারণা নেন।

এদিকে, নানাজন থেকে ত্রাণ সামগ্রী পেয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করেছেন রোহিঙ্গারা। স্বজন-পরিজন, বাস্তুভিটা, সহায় সম্বল হারানোর শোক কাটিয়ে বেঁচে থাকার অবিরাম চেষ্টা করছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তাদের কারো কারো চুলায় আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও মানুষের দেয়া ত্রাণ দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ, দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে তারা। যদিও অনেকের ঘরে এখনো চাল থাকলেও চুলা নেই। আশ্রয়ের স্থান মিললেও তা পরিবারের সদস্য সংখ্যার অনুপাতে খুবই নগণ্য। এরসাথে রোগবালাইয়ের কষ্ট, স্বজন হারানোর বেদনাতো আছেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল শনিবার সকালে ৩৬ বীর, ২৪ বেঙ্গল ও ৬৩ বেঙ্গল নামে ৩টি টিম রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ও থাইংখালী আসে। এসময় ক্যাম্প কমান্ডার মেজর মো. রাশেদ আকতার বলেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত মতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় এসে সেনা সদস্যরা সড়কে শৃংখলা আনতে কাজ শুরু করে। অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও বিচ্ছিন্ন ত্রাণ বিতরণ এবং রাস্তায় রোহিঙ্গাদের অহেতুক জটলা সরিয়ে দিয়ে সড়ক যোগাযোগ নির্বিঘ্ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এরপর কন্ট্রোল রুমে জমা হওয়া দ্রুত পচনযোগ্য  খাবারগুলো আলাদা করে বিতরণ করা হবে। বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আওতায় আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে এসব ত্রাণ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, কাজের সুবিধার্থে উখিয়া ডিগ্রি কলেজের পরিত্যাক্ত একটি কক্ষকে কোম্পানির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

জেলা পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন বলেন, উখিয়ার ৭১ কিলোমিটার জুড়ে বসানো হয়েছে ১১টি চেকপোস্ট। ২২টি মোবাইল টিম কাজ করছে।

রোহিঙ্গাদের এখানে কাজের সুযোগ না থাকলেও অসংখ্য মানুষ, সরকারি সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও দাতা সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য খাবার দাবার, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, গৃহস্থালী আসবাব, নলকূপ, লেট্টিনসহ জীবন ধারণের যাবতীয় উপাদানের আপাত যোগান দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কি হয়, সেটা না ভেবে আপাতত কিভাবে কিছুটা ভালোভাবে বেঁচে থাকা যায় তা নিয়েই ব্যস্ত।

থ্যাইংখালীর শিবিরে চার সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন খাদিজা বেগম। স্বামীকে হারিয়েছেন মংডুতে। দুই সন্তান এখনো ছোটো, বড় দুইজনের একজনের বয়স ৯, অন্যজনের বয়স ১১। গতকাল দুপুরে নিজের ঘরে বসে বলছিলেন, একটি সংস্থা তাদের একটি ত্রিপল দিয়েছে। আরো টুকটাক সামগ্রী পেয়েছেন। সকালে বড় দুই ছেলে রাস্তায় গেছে। কেউ যদি কিছু দেয় সে আশায়।

এদিকে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে অসুস্থ হয়ে পড়া বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গতকাল পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, প্রচন্ড গরমের কারণে হিটস্ট্রোকেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে কোনো চিকিত্সকের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শরণার্থীদের জন্য স্যানেটারি ল্যাট্টিন, নলকূপ ও শেড : রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ১ হাজার ২০০ স্যানিটারি ল্যাট্টিন ও ১ হাজার ২০০টি নলকূপ বসানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন। গতকাল এক প্রেসিব্রিফিংয়ে তিনি জানান, ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এ সকল আশ্রয়প্রার্থীরা উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি উদ্যোগে খাদ্য, পুষ্টি, সুপেয় পানি, স্যানিটেশনসহ সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ১ হাজার ২০০ স্যানিটারি ল্যাট্টিন ও ১ হাজার ২০০ নলকূপ বসানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫০০ স্যানিটারি ল্যাট্টিন ও ১০০ নলকূপ বসানো হয়েছে। এছাড়া আইওএম ৬০০ স্যানিটারি ল্যাট্টিন তৈরি করবে। এছাড়া বালুখালীর প্রস্তাবিত দুই হাজার একর জায়গায় অস্থায়ীভাবে ১৪ হাজার শেড নির্মাণ করা হবে। এসব শেডে ৮৪ হাজার পরিবার আশ্রয় নিতে পারবে।

এদিকে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য সহায়তা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার প্রদানের বিবেচনা করছে। যদিও কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সাড়ে চার কোটি ডলার প্রদান করবে।

ইত্তেফাক/নূহু