কোটালীপাড়ায় ৪০০ বছরের দুর্গাপূজা

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সাংবাদিক নির্মল সেনের বাড়িতে ৪০০ বছর ধরে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
 
বাংলা ১০২৪ সালে কোটালীপাড়া উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামে নির্মল সেনের পৈতৃক বাড়িতে পিতৃ পুরুষ রাম তনু সেনগুপ্ত ও রাম দয়াল সেনগুপ্ত দুর্গা পূজা প্রচলন করেন। তারপর থেকে ওই বাড়িতে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এ বছর ওই পূজা ৪০০ বছরে পা দিয়েছে। এখানে চণ্ডিপাঠ, মন্ত্র উচ্চারণ, ঢাকের বাদ্য, কাসর ঘন্টা, আরতি, উলুধ্বনিসহ নানা উপাচারে হূদয়ের অর্ঘ নিবেদন করে দেবীর প্রতি অঞ্জলী নিবেদন করা হয়। এ বাড়িতে বৈদিক নিয়মে সাপ্তিক পূজা সম্পন্ন করা হয়। পূজায় কোনো তমসিক স্পর্শ নেই। বনেদি বাড়ির পূজা হিসাবে দীঘিরপাড় গ্রামের সেন বাড়ি দুর্গাপূজা স্বীকৃতি পেয়েছে।
 
চন্দন সেনগুপ্ত অর্পন জানান, সেনবাড়ির পূজা প্রচলনা করার পর ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত মহিষ বলি দেয়া হত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগের বছর নির্মল সেনের মেজ ভাই বিমল সেন শেষ বারের মতো দুর্গা পূজায় মহিষ বলি দেন। তারপর মহিষ বলি বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৪৮ সালে ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত পূজায় পাঠা বলি প্রচলন করে সেন পরিবার। পরে পাঠাবলি আরো কমিয়ে আনা হয়। ২০ বছর আগে জমিদার শশী সেনগুপ্তের ছেলে সুনীল সেনগুপ্ত সপ্তমী ও অষ্টমী পূজায় পাঠা বলির প্রথা প্রচলন করেন। তারপর থেকে সেনড়ির পূজার ২ দিন পাঠা বলি অব্যাহত রয়েছে।
 
এ পরিবারের বিখ্যাত ব্যক্তিরা হলেন, ভারতের দি ষ্টেটেমেন্ট পত্রিকার সাবেক সম্পাদক, পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের সভাপতি ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক প্রয়াত ড. ধীরেন সেন। কোলাকাতা সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রয়াত সুশীল সেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের  শিক্ষক সুশীল সেন রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ওপর ৩৮ টি বই  রচনা করেছেন। তারই ভারতে এখনো পাড়ানো হয়। নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত সতু সেন এ পরিবারের আরো এক গুণী ব্যক্তিত্ব। তিনি নাট্য অভিনয়, পরিচালনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। রিবলবিং নাট্য মঞ্চের  উদ্ভাবক হিসেবে অমর হয়ে আছেন।
 
প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক, রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা নির্মল সেন ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। মাতার নাম লাবণ্যপ্রভা সেনগুপ্তা। তাঁর একাডেমিক নাম নির্মল কুমার সেনগুপ্ত। তিনি ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারী  মৃত্যু বরন করেন। এ পরিবারের পূর্ব পুরুষেরা কবিরাজি পেশায় নিয়োজিত থেকে মানুষের চিকিত্সা সেবা করেছে। কবিরাজ হিসেবে সারদা সেনগুপ্ত ও কার্ত্তিক সেনগুপ্ত যশ ও খ্যাতি অর্জন করেন। কার্ত্তিক সেনগুপ্ত টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী বাজারে কবিরাজি করতেন। এ সূত্র ধরে বঙ্গবন্ধুর পরিবারে সাথে তার সু সম্পর্ক ছিলো। ওই পরিবারের চিকিত্সায় তাকেই ডাকা হতো।
 
রাম তনু সেন গুপ্তের ৯ম পুরুষ রতন সেনগুপ্ত কংকন বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষ মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের পোড়াগাছ গ্রামে বসবাস করতেন। মোঘল আমলে বর্গিরা আক্রমন করলে দু’ ভাই  রাম তনু সেনগুপ্ত ও রাম দয়াল সেন গুপ্ত  মুসলিম ১টি প্রজা পরিবারকে সাথে নিয়ে দিঘীরপাড় গ্রামে চলে আসেন। তারা এখানে বসবাস শুরু করেন। তারপর বাংলা ১০২৪ সালে দুর্গা পূজার প্রচলন করেন। তারপর থেকে পূজা চলছে। এ বছর পূজার ৪০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। আমাদের পৈতৃক নিবাসের পোড়াগাছা গ্রামটি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন আর এ গ্রামের অস্তিস্ত নেই।
 
ইত্তেফাক/এএম।