বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় খুচরা মূল্য ৭২ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বর্তমান মূল্য ৬ টাকা ৭৩ পয়সার সাথে আরো ৯৮ পয়সা বাড়িয়ে ৭ টাকা ৭১ পয়সায় পুন-নির্ধারণের আবেদন করেছিল পিডিবি। ওই আবেদন যাচাই-বাছাইশেষে ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ হারে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে মত দেয় বিইআরসি।
তবে ভোক্তা প্রতিনিধিদের দাবি, পিডিবির অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম, সরকারের নীতিগত ভুল দূর করা হলে নিত্য ব্যবহৃত এ সেবা-পণ্যের দাম বাড়াতে হবে না। এমনকি পাইকারি পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি না হলে বিদ্যুতের দাম কমানো যাবে। স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ নষ্ট করে বেশি-মূল্যে উৎপাদন করা হচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপছে জনগণের ওপর। এটি জাতীয় দুর্ভাগ্য।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর টিসিবি মিলনায়তনে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য বৃদ্ধিতে পিডিবির প্রস্তাবের ওপর বিইআরসির গণশুনানিতে এ বক্তব্য উঠে আসে। আরইবির প্রস্তাবের ওপর আজ বুধবার এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) প্রস্তাবের ওপর বৃহস্পতিবার শুনানি গ্রহণ করা হবে।
এদিকে নতুন তিনটি গ্রাহক-শ্রেণি তৈরি করে বিদ্যুতের পৃথক মূল্য-হার নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। এগুলো হলো- বহুতল আবাসিক ভবন বা সমিতির মাধ্যমে পরিচালিত যৌথ বাড়ি-আবাসন, বৃহৎ পূর্ত নির্মাণ কাজের জন্য অস্থায়ী সংযোগ এবং ব্যাটারি চালিত যানবাহন। এক্ষেত্রে পিডিবি বলছে, বহুতল আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটের মালিকরা সচ্ছল ও বিদ্যুতের প্রকৃত সরবরাহ ব্যয় পরিশোধে সক্ষম। পার্শ্ববর্তী দেশেও এমন গ্রাহকদের জন্য আলাদা মূল্য-হার রয়েছে। তাই এদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৮০ পয়সা করা দরকার। দেশে দুই লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা/থ্রিহুইলার রয়েছে। এগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো মূল্য-হার না থাকায় অনাবাসিক ডি শ্রেণিভুক্ত করে বিদ্যুৎ বিল গ্রহণ করা হচ্ছে। এ শ্রেণির বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২৫ পয়সা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বড় পূর্ত নির্মাণ কাজগুলো তিন মাসের জন্য অস্থায়ী সংযোগ নিলেও প্রকৃতপক্ষে এ কাজ সম্পন্ন করতে অনেক সময় লাগে। এগুলোর বিদ্যুতের মূল্যও উচ্চহারে নির্ধারিত হয়। অস্থায়ী সংযোগের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা ৩০ পয়সা। তবে বিইআরসির কমিটি জানায়, পূর্ত নির্মাণ শিরোনামে নতুন গ্রাহকশ্রেণি তৈরি করা যেতে পারে। তবে উৎসব, মেলা বা প্রদর্শনীর মত স্বল্পস্থায়ী অনুষ্ঠানের জন্য বিদ্যমান বিলিং পদ্ধতিই বহাল রাখা যেতে পারে। ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে জে শ্রেণিতে (রাস্তার বাতি ও পানির পাম্প) আওতাভুক্ত করা যেতে পারে। পাইকারি আবাসিক গ্রাহকদের জন্য অভিন্ন বিলিং পদ্ধতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এদিকে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের জন্য কিছুটা হলেও সুখবর রয়েছে এবারের শুনানিতে। এই শ্রেণির গ্রাহকরা বিদ্যুতের দাম অগ্রিম পরিশোধ করেন বলে তাদের কাছ থেকে জামানতের টাকা গ্রহণ না করার প্রস্তাব করেছে পিডিবি।
শুনানিতে অংশ নিয়ে ভোক্তা প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করে বলেছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ালে ছোট বড় সব ধরনের শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবন যাপনের ব্যয় বাড়বে। বন্ধ হয়ে যাবে অনেক শিল্প কারখানা। বেকারত্ব বাড়বে। অর্থনীতি চাপে পড়বে।
শুনানিতে পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ কেনা-বেচার মধ্যে ঘাটতি থাকায় প্রতি ইউনিটে ৩ শতাংশ হারে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫শ’ ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়লে চলতিবছর লোকসান আরও বাড়বে। তাই গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি মানা হচ্ছে না। পিডিবির কম দামের বিদ্যুতের উৎপাদন বন্ধ রেখে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে বেশি দামের বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। এভাবে অপচয়, অব্যবস্থাপনা ও সরকারের ভুল নীতির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। আর ঘাটতি মেটানোর দায়ভার গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এটা যৌক্তিক হতে পারে না। এটি আমাদের জাতীয় দুর্ভাগ্য।
গণশুনানিতে সভাপতিত্ব করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান ও সাবেক বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ার ইসলাম। শুনানিতে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য রহমান মুরশেদ, মাহমুদউল হক ভুঁইয়া, আব্দুল আজিজ খান ও মিজানুর রহমান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিপিবির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স ও গণসংহতির জুনায়েদ সাকী।
ইত্তেফাক/আনিসুর