একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

রাজশাহী জেলাজুড়ে নির্বাচনী আমেজ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো প্রায় দেড় বছর বাকি। তবে রাজশাহীতে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা তত্পরতা শুরু করে দিয়েছেন। জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী আমেজ। জেলার আনাচে-কানাচে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের রঙিন ডিজিটাল ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার। রমজানে দেখা গিয়েছিল ইফতার মাহফিলের আয়োজন। ঈদুল আজহায় গণসংযোগ। সবশেষে শারদীয় দুর্গাপূজায় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মন্ডপে মন্ডপে শুভেচ্ছা বিনিময়।  নেতাদের উপস্থিতি তৃণমূলে চাঙ্গা করে তুলেছে ভোটের রাজনীতি।

এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা অনেকটা এগিয়ে। একসময়কার কথিত প্রভাবশালী জামায়াত নেতারা নিশ্চুপ। যুদ্ধাপরাধে দায়ে দলীয় শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এরপর দলের নিবন্ধন বাতিল ও একের পর এক সহিংসতার মামলা হয়েছে। এরসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।  

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একসময়কার বিএনপির ঘাঁটি বলে বলে পরিচিত রাজশাহী। এখন সবগুলো নির্বাচনী এলাকা আওয়ামী লীগ ও শরীকদের দখলে। বিএনপির নেতারা হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নামবেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও শরীক দলের নেতারা বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে একাট্টা হবেন। এমনটাই প্রত্যাশা উভয় দলের কর্মী-সমর্থকদের। কিন্তু মাঠের বাস্তবচিত্র যেন ঠিক উল্টো। দলীয় মনোনয়নের জন্য হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতারা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভক্ত উভয় দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। জানা যায়, আগে রাজশাহী জেলায় নির্বাচনী আসন ছিল পাঁচটি। ২০০৮ সালে ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা হয়। রাজশাহী সিটি করপোরেশন এবং বাগমারা উপজেলা নিয়ে একটি আসন করা হয়। ফলে রাজশাহীতে আসন সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ছয়টি। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রাজশাহী-৪ (পুঠিয়া ও দুর্গাপুর) আসন বাদে চারটিই পেয়েছিল বিএনপি। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে রাজশাহী-৪ আসনসহ সবগুলো আসনই পায় বিএনপি। ২০০১ সালের নির্বাচনেও সবগুলো আসন বিএনপির দখলেই ছিল।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে সর্বহারা নিধন কর্মসূচি চলতে থাকে। সর্বহারা দমনে বিএনপির কতিপয় শীর্ষ নেতা ও প্রশাসন প্রকাশ্যে মাঠে নামে। তাদের সহায়তায় বাংলাভাইয়ের নেতৃত্বে জঙ্গি শাসন শুরু হয়। এনিয়ে জনগণের ক্ষোভ ও দলীয় কোন্দল বিএনপির ঘাঁটি তছনছ করে দেয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে রাজশাহীর ছয়টি আসনের সবগুলোতে জয় পায় আওয়ামী লীগ ও শরীকরা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচনে  চারটিতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায় আওয়ামী লীগ। দুটিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত বনাম আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই জয় পায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে যেসব কারণে সবগুলো সংসদীয় আসন হারিয়েছে বিএনপি; একই কারণে আগামী নির্বাচনে সবগুলো হারাতে পারে আওয়ামী লীগ ও শরীকরা। দলীয় নেতাকর্মীরা যেমন এমপি-মন্ত্রীর কাছ থেকে সবকাজ ও ক্ষমতা প্রত্যাশা করে। কিন্তু এমপি-মন্ত্রীরা করেন ঠিক তার উল্টো। এসব নিয়ে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের যোজন যোজন দূরত্ব। এছাড়া পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা, জনবিচ্ছিন্নতা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ তো রয়েছেই। এমপি ও শীর্ষ নেতাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, কর্মীর সঠিক মূল্যায়ন না করা। তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এমপি ও শীর্ষ নেতাদের কাছে পাত্তা পান না। এমপি-মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতারা যেমন বিতর্কিতদের মূল্যায়ন করেন, তেমনি বিতর্কিতরাও তাদের সর্বক্ষণ ঘিরে থাকেন। এসব কারণে এমপি-মন্ত্রী এমনকি দলীয় শীর্ষ নেতারাও ইমেজ সংকটে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

ইত্তেফাক/নূহু