অন্যের নামে সিম নিবন্ধনের ভয়াবহ চিত্র

চিরকালই দেখা গিয়াছে অপরাধীরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তার সহিত তাহাদের অপরাধকর্ম চালাইয়া যান। প্রকৃতপক্ষে ওই সূক্ষ্ম বুদ্ধি না থাকিলে বিস্তর পরিসরে অপরাধ সংঘটিত করা সম্ভব নহে। মোবাইল ফোনকেন্দ্রিক অপরাধ ঠেকাইতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও আঙুলের ছাপ দিয়া বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম রেজিস্ট্রেশন শুরু হয় ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর। অতি উত্তম ব্যবস্থা বটে। আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরিয়া অপরাধীদের সালতামামি বাহির করা খুব কঠিন কাজ নহে। কিন্তু পুলিশ যখন ডালে ডালে আড়ি পাতে, চোর তখন পাতায় পাতায় নিজের আড়াল খুঁজিবার পথ বাহির করিতে চাহে। সুতরাং বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু হইবার পরও অপরাধীরা নূতন উপায়ে খুঁজিয়া লয় মোবাইল ফোনে অপরাধ করিবার ফাঁকফোকর। পুলিশের একাধিক সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায় যে, শতকরা ৯৫ ভাগ অপরাধী এখন অন্যের নামে রেজিস্ট্রেশন করা সিম ব্যবহার করিয়া অপরাধ সংঘটিত করিতেছে।

সাধারণ আমজনতার ভিতর হইতে তুলনামূলক সহজ-সরল বয়স্ক অশিক্ষিত কিংবা গরিব কেহ যখন তাহার নামের নূতন কোনো সিম বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন করিতে আসেন, তখন অনেক সময় ওই ব্যক্তির অজ্ঞাতসারে তাহার নামে আরো একাধিক সিম নিবন্ধন করিয়া রাখা হয়। অতঃপর ওই অতিরিক্ত নিবন্ধিত সিমটি একটু বেশি মূল্যে বিক্রয় হইয়া যায় অপরাধীদের নিকট। তাহারা তখন ওই সিম ব্যবহার করিয়া মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, জঙ্গি কার্যক্রম হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ সংঘটিত করিয়া থাকে। অন্যদিকে, ইত্তেফাকে গতকাল সোমবার প্রকাশিত একটি রিপোর্ট হইতে জানা যায় যে, একটি এনআইডি নম্বর দিয়া ৪২ হাজার সিম নিবন্ধন করা হইয়াছে! অথচ একটি সিম দিয়া ১৫টির বেশি সিম নিবন্ধন করিবার নিয়ম নাই। ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের একটি মার্কেট হইতে ভুয়া নিবন্ধিত চার হাজার ৩২১টি সচল সিম উদ্ধার করিয়াছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। বিটিআরসি সূত্রে জানা গিয়াছে যে, একটি এনআইডির বিপরীতে ১৫টির বেশি সিম আছে বর্তমানে ২৬ লক্ষ ৩০ হাজারটি। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলির যাচাই-বাছাই ছাড়াই গ্রাহক নিবন্ধন করিবার সুযোগ লইতেছে অপরাধীরা। এমনকী কোথাও কোথাও একই জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়া একই নামে দুই ব্যক্তির ছবি দিয়া নিবন্ধন করা হইলেও মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় নাই। সুতরাং এই দায় সর্বপ্রথম বর্তায় মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলির ওপর। যদিও বিটিআরসি কিছুদিন আগে বলিয়াছে যে, কোনো অবস্থাতেই বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ছাড়া মোবাইল সিম বিক্রি, অসত্য তথ্য দিয়া নিবন্ধন এবং আগে হইতে চালু (প্রি-অ্যাক্টিভেটেড) সিম বা রিম ব্যবহার, বিতরণ, পরিবেশন, কেনাবেচা বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করা যাইবে না। এই অপরাধে প্রতিটি সিমের জন্য অপারেটরকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করিবার বিধান জারি করা হইয়াছে।

কিন্তু প্রশ্ন হইল, ১৫টির বেশি সিম না হয় বাতিল করা হইবে, কিন্তু ওই ১৫টি সিমের মধ্যেই যাহাদের অজ্ঞাতে একাধিক সিম নিবন্ধন করিয়া নেওয়া হইয়াছে, সেই সিমগুলির কী হইবে? বিষয়টি দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের সহিত যুক্ত বিধায় ইহার একটি কার্যকরী সমাধান অতি আবশ্যক।