টানা বৃষ্টিতে দুর্ভোগ

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে রাজধানীসহ সারাদেশে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর অনেক এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে বিভিন্ন সড়ক। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই ঘর থেকে বের হননি। তবে কাজের প্রয়োজনে যারা বের হয়েছেন, দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের। বৃষ্টির সঙ্গে জলজট এবং যানজট দেখা দেওয়ায় ভোগান্তি বেড়ে যায়। কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউসহ মিরপুর রোড ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং রোকেয়া সরণির শেওড়াপাড়া থেকে মিরপুর ১২ নম্বর মোড় পর্যন্ত যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় নগরবাসীকে।
 
বৃষ্টিতে নিউ ইস্কাটন রোডের দক্ষিণ পাশের সড়কে হাঁটু পানি জমে যায়। ফুটপাতেও ছিল পানি। বৃষ্টিতে অনেক দোকান ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে যায়। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে অনেক সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল বন্ধ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের কয়েকটি সড়কেও হাঁটুপানি ছিল।
 
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটার পর থেকেই রাজধানীতে বৃষ্টি শুরু হয়। গতকাল শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। কোথাও থেমে থেমে, আবার কোথাও বিরামহীন বৃষ্টিপাত হয়।
 
আবহাওয়াবিদ মো. সারোয়ার আলম বলেন, নিম্নচাপের কারণে আজ শনিবারও বৃষ্টিপাত থাকতে পারে। শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরগুলোর জন্য তিন নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত জারি করা ছিল।
 
এদিকে শুক্রবার ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজটে ভোগান্তি পোহান যাত্রীরা। মতিঝিলে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা গোবিন্দ চন্দ্র দে বলেন, সামান্য বৃষ্টিপাতেই মতিঝিল,দিলকুশা,ফকিরাপুল,গুলিস্তান,পল্টন,সায়দাবাসহ সচিবালয় ও আশপাশের এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। লালমাটিয়ার বাসিন্দা সেলিম সাজ্জাদ বলেন, ‘ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকায় রাস্তায় হাঁটু পানি জমেছে। মানিক মিয়া ও আসাদগেট, লালমাটিয়াসহ মোহাম্মদপুরের অনেক এলাকা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। পথচারীরা সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা পড়েছে বিপাকে। ’
 
মিরপুরের বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন,‘বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রোকেয়া সরণির বিভিন্ন অংশ। চরম দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। উন্নয়নের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এতে ভোগান্তি আরও বেড়ে গেছে পথচারীদের।’
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর বনশ্রী, দক্ষিণ বনশ্রী, পূর্ব রামপুরা, খিলগাঁও, বাসাবো, মাদারটেক, যাত্রাবাড়ী, সায়দাবাদ, পোস্তগোলা, ফরিদাবাদ, কদমতলী, সুত্রাপুর, শ্যামপুর, নাজিমউদ্দিন রোড, আগাসাদেক রোড, নাজিরা বাজার, আজিমপুর, পল্টন, শাহবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুলশান, বনানী, উত্তরাসহ প্রায় সবখানেই বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। 
 
এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ‘নগরজুড়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানি সহজেই নেমে যাচ্ছে। আবার কোথাও জলজটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও পরিদর্শকরা মাঠে আছেন। তারা জলজট নিরসনে কাজ করছেন।’
 
বিশিষ্টনগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজধানীর মধ্য দিয়ে প্রবহমান খালগুলো দখল ও ভরাট করে সেখানে বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে। ফলে পানি সরতে পারছে না। এ ছাড়া ময়লা আবর্জনায় ড্রেন ভর্তি হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। আগে ঢাকায় ৪০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত না হলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। এখন ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়ানক জলাবদ্ধতা। এর জন্য মূলত দায়ী ওয়াসার ড্রেনগুলো ভর্তি হয়ে যাওয়া। তিনি ড্রেনগুলো অনতিবিলম্বে পরিষ্কার, ঢাকার খাল ও চারপাশের নদীগুলো উদ্ধার করে তা সংরক্ষণের দাবি জানান।
 
আরেক নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সিটি কর্পোরেশন থেকেও রাস্তার দুই ধারে যেসব ড্রেন করা হয়েছে তা আবর্জনায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পানির ধারণক্ষমতা অনেক কমে গেছে। ড্রেনের ধারণক্ষমতা কমে গিয়ে পানি উপচে রাস্তায় চলে আসছে। তিনি খালগুলো উদ্ধার ও দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসার মহা-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও রাজউকের মধ্যে সমন্বয় সাধনের ওপর জোর দেন।
 
এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, ‘ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ মিলিলিটার বৃষ্টির পানি ধারণের ক্ষমতা ওয়াসার নেই। তারপরও নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে ঢাকা ওয়াসা কাজ করছে। নগরীর মধ্য দিয়ে প্রবহমান খালগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার সমন্বিত উদ্যোগে একটি খাল উদ্ধারও করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা ওয়াসার একটি মহা-পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ইনশাআল্লাহ এই সমস্যা দূর হয়ে যাবে। ’
 
‘আজও বৃষ্টি হতে পারে’
 
নিম্নচাপের কারণে শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হয়েছে। আজ শনিবার দেশের অধিকাংশ স্থানে অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। তবে রবিবার থেকে অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এদিকে গতকাল সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে গোপালগঞ্জে ১৪৩ মি.মি.।
 
এছাড়া হাতিয়া ও মাদারীপুরে ১১৩ মি.মি., খুলনায় ১১১ মি.মি., বরিশালে ১০৩ মি.মি., পটুয়াখালীতে ১০২ মি.মি., মংলায় ৯৮ মি.মি., ঢাকা, মাইজদীকোর্ট ও সাতক্ষীরায় ৯৫ মি.মি., যশোরে ৯৩ মি.মি., চাঁদপুরে ৮৬ মি.মি., খেপুপাড়ায় ৮৩ মি.মি., কুমারখালীতে ৭৯ মি.মি. এবং ফরিদপুরে ৭৭ মি.মি. বৃষ্টিপাত হয়েছে।
 
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উপকূলীয় উড়িষ্যা ও তত্সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত স্থল নিম্নচাপটি উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে গতকাল দুপুর ১২টায় গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং তত্সংলগ্ন বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চল ও উড়িষ্যা এলাকায় অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর/উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে এবং গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর সমূহকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
 
নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১-২ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ু তাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
 
ইত্তেফাক/রেজা