ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই প্রশ্ন ফাঁস হয়নি বলে দাবি করেছে। শনিবার বিকালে ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষার সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমনটিই দাবি করা হয়। যদিও পরীক্ষার দিন প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ জানানো হলে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে কিনা তদন্ত করে দেখবো’
প্রসঙ্গত, শুক্রবারের ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কয়েকজন সাংবাদিকের ই-মেইলে ইংরেজি অংশের ২৪টি প্রশ্ন পাঠানো হয়। পাঠানো প্রশ্নের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়। এছাড়া পরীক্ষা শেষ হওয়ার দশ মিনিট পূর্বেই এই প্রতিবেদকের মেসেঞ্জারেও প্রশ্ন পাঠানো হয়। যার সঙ্গে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল ছিলো।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের দাবী অসত্য ও বাস্তবসম্মত নয়। যে প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন প্রণয়ন ও মুদ্রণ হয় তা এতোটাই গোপনীয়তার মধ্যে করা হয় যে, তাতে ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’-এর কোন সুযোগ নেই।
বিজ্ঞপ্তিতে তিনি যারা রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র পেয়েছিলেন তারা পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনকে অবহিত না করে সংবাদ প্রকাশ করায় উদ্বিগ্ন প্রকাশ করেন।
তবে এ বিষয়ে ই-মেইলে প্রশ্ন পাওয়া একজন বলেন, পরীক্ষা না হয়ে গেলে বুঝবো কেমন করে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কি না?
এদিকে, একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন ঢাবি ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এই প্রতিবেদক শুক্রবার সকাল আটটার দিকে ক্যাম্পাসে বের হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক হলের সামনে রাখা মাইক্রোবাসের পেছনে বেলা ৯টার দিকে কয়েকজন মোবাইল ফোনে সুস্থিরভাবে কিছু দেখছিলেন। এই প্রতিবেদক একজনকে কি দেখছেন জিজ্ঞাসা করলে তিনি দৌঁড়ে পালান। এ সময় সামনে থাকা পুলিশকে তাকে ধরতে বললেও পুলিশ তাকে ধরেনি। সে পালিয়ে যায়।
পরে বেলা সাড়ে ৯টার দিকে ভর্তিচ্ছু এক মেয়েকে মোবাইল ফোন থেকে কিছু সংগ্রহ করতে দেখে এ প্রতিবেদক। তার কাছে ‘কি দেখছে’ জানতে চাইলে তিনি গালি-গালাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ওই ভর্তিচ্ছুর মোবাইল প্রক্টরিয়াল বডির সাহায্যে প্রক্টর রুমে নেওয়া হয়। তার মোবাইলে প্রশ্নের জন্য চুক্তির প্রমাণ মেলে। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন তার ফোনে পাঠানো প্রশ্নের মিল না পাওয়ায় তার প্রবেশপত্রের কপি রেখে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরীক্ষার কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত ভর্তিচ্ছুদের নজর মোবাইলে ছিলো বলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।
ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা। তারা অবিলম্বে পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, একটি প্রশ্ন ফাঁস, হাজারো-লাখো স্বপ্নের ফাঁস! গোটা জাতির গলার ফাঁস। অর্ক নামে একজন বলেন, মুখ বুজে প্রশ্নফাঁসের অন্যায় মেনে নেওয়া মানে গরীব মেধাবীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পথ রুদ্ধ করে দেওয়া।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক ছাত্র লিংকন মোহাম্মদ লুৎফরজামান সরকার বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে কেউ ভাবে না। প্রশ্ন ফাঁস হলো! আমরা কি প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মিশনে নেমেছি?
মোতাসির সিরাজ নামে একজন বলেন, প্রশ্নফাঁসের নিখুঁত প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ক্ষেত্রে পরীক্ষা বাতিল ছাড়া কোনো সমাধান গ্রহণযোগ্য নয়।
ছাত্র ফ্রন্টের মিছিল প্রতিবাদ মিছিল আজ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্ত প্রশাসন ও গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রলীগ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট আজ দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল করবে। সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক ভজন বিশ্বাস স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিটি ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস এখন এক সাধারণ ঘটনা। ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের ক্ষেত্রে তা মাত্রা ছাড়িয়েছে। শিক্ষক ও ছাত্রলীগের যুক্ততা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা ঘটা অসম্ভব। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের কারণে অর্থের কাছে পরাজিত হচ্ছে মেধাবীরা।
ইত্তেফাক/নূহু